Thursday, February 20, 2020


দেখে নিন বিশ্বে কোন ভাষায় কত সংখ্যক মানুষ কথা বলে

বিশ্বে মোট ভাষার সংখ্যা ৭হাজার ১১১টি
ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী কোন ভাষায় কতো সংখ্যক মানুষ কথা বলে তা তুলে ধরা হলো---
১। ইংরাজী- ১১৩ কোটি ২৩ লক্ষ৷ ৬৬হাজার ৬৮০ জন।

২। মান্দারিন চাইনিজ -১১১কোটি৬৫লক্ষ ৯৬হাজার জন

৩।হিন্দি-৬১কোটি ৫৪লক্ষ৭৫হাজার ৫৪০জন।

৪।স্প্যানিশ - ৫৩ কোটি ৪৩লক্ষ ৩৫হাজার৭৩০জন

৫।ফ্রেঞ্চ- ২৭কোটি ৯৮ লক্ষ ২১ হাজার ৯৩০ জন

৬।আরবি- ২৭ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ৭০০ জন।

৭।বাংলা-২৬কোটি ৫০ লক্ষ ৪২ হাজার৪৮০ জন

৮।তেলেগু- ৯কোটি ৩৯ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৪০ জন

৯।তামিল৮ কোটি ৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ১৩০ জন

১০।মালায়ম ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৭০ জন

Wednesday, February 19, 2020

ঐতিহ্যময় মৌখিরা।
          # ফিরোজ আলি কাঞ্চন#
পূর্ব বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম অঞ্চলের এই গ্রামে আছে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির।মানকর স্টেশন থেকে গেড়াই বিষ্টুপুর যাবার পথ ধরে প্রায় ২৫কিমি দূরত্বে এই গ্রাম,আবার এলেমবাজারের ১১মাইল থেকেও যাওয়া যায়।প্রথমেই চোখে পরবে সারিবদ্ধ ভাবে মুখোমুখি বেশ কিছু শিব  মন্দির।পশ্চিম মুখি তিনটি ডান দিকে ও পূব মুখি দুটি মন্দির বাম দিকে দেউল রীতিতে নির্মিত। বামদিকেই আর একটি উত্তর মুখি আটচালা রীতিতে নির্মিত মন্দির।একেবারে সামনে সোজাসুজি আর একটি আটচালা রীতিতে নির্মিত দক্ষিন মুখি মন্দির।এই মন্দির টি থেকে কিছু দূরে ডানদিকে উত্তর মুখি একটি বড়ো পঞ্চচূড়া লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির।প্রত্যেকটি মন্দিরের খিলানে টেরাকোটা কাজের নান্দনিক সৌন্দর্য খুবই আকর্ষনীয়।এই মন্দিরগুলি রায় পরিবার নির্মিত। মন্দির গুলির প্রতিষ্ঠা সাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।দক্ষিণ মুখি আটচালা মন্দিরের ফলকে ১৭১৫ শকাব্দ,সন ১২০০ দেখা যায়।তবে এখানের সব মন্দিরগুলি যে একই সময়ে একই সঙ্গে নির্মিত হয়েছিল তা বলা যায় না।ঠিক মতো প্রচার পেলে এ গ্রাম ছোট খাটো পর্যটন কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠতে পারে।
#ফিরোজ আলি কাঞ্চন#








Thursday, February 6, 2020


জি.আই.স্বীকৃত বর্দ্ধমানের সীতাভোগ  আর মিহিদানার
             
                                                   
রসোগোল্লা নিয়ে বাংলা আর ওড়িশার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও সীতাভোগ আর মিহিদানা যে বধ'মানের তা এতোদিনে নিশ্চিত হওয়া গেলো ২০১৭ সালে।দাজি'লিংয়ের চা,নবদ্বীপের দই,জয় নগরের মোয়া,ধনেখালির শাড়ি ইত্যাদির মতো বধ'মানের সীতাভোগ ও মিহিদানা
           বধ'মানে সীতাভোগ ও মিহিদানার জন্ম কাহিনী নিয়ে দুটি মত প্রচলিত।প্রথমত,১৯০৪সালের ৯আগষ্ট তখনকার ভাইসরয় লড' কাজ'ন এবং লেডি কাজ'ন বধ'মানে এসেছিলেন,ইনাদের আপ্যায়নের জন্য বধ'মানের মহারাজ বিজয় ছাঁদ মহাতাব নগরের নামকরা মিষ্টান্ন  প্রস্তুতকারী ভৈরবচন্দ্র নাগকে কোন নতুন ধরনের সুস্বাদু  মিষ্টি  তৈরীর প্রস্তাব দেন।ভৈরব চন্দ্র নাগ মহারাজের অনুরোধে প্রস্তুত করলেন দুটি অসাধারন মিষ্টান্ন, মূল উপকরণে সবেদা বা গোবিন্দভোগ চালের গুড়ি দিয়ে সীতাভোগ  আর বেসন দিয়ে মিহিদানা।আবার অন্যমতে ১৯০৬সালে বধ'মানে হওয়া নিখিল বজ্ঞ সাহিত্যসম্মেলনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সম্মানীয় বিজ্ঞজন দের জন্যই নাকি প্রথম তৈরী করা হয়েছিল সীতাভোগ  ও মিহিদানার।জন্ম নিয়ে বিতক' যাই থাকনা কেনো,বধ'মানের এই সীতাভোগ  মিহিদানা  খেয়ে  মুগ্ধ হয়ে সুনাম করতে বাধ্য হয়েছিলেন লড' কাজ'ন থেকে ১৯৬৫সালে দুগা'পুরে কংগ্রেসের এক সম্মেলেনে এসে তখনকার  প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও জহরলাল নেহেরু পয'ন্ত।
               এতোদিন পয'ন্ত এই বিখ্যত মিষ্টান্ন দুটির প্রতি বধ'মানের কোন ভৌগলীক স্বীকৃতি ছিল না,কিন্তু ২০১৭ সালে১লা এপ্রিল জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশনের নিজশ্ব ওয়েবসাইটে সেই বহু প্রতিক্ষার স্বীকৃতির কথা জানানো হলো।জি.আই. সীতাভোগ কে সারা ভারতের মধ্যে ৫২৫ তম স্থানে,রাজ্যের মধ্যে ১২ তম স্থানে ও মিহিদানাকে দেশের মধ্যে ৫২৬ তম স্থানে,রাজ্যের মধ্যে ১৩ তম স্থানে ভৌগলিক স্বীকৃতি দিল।আর এই স্বীকৃতির মূলে রয়েছে শহরের তেতাল্লিশ জন মিষ্টি ব্যবসায়ীর এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা।'ট্রেডাস' ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ' প্রথমে রাজ্য সরকারের মাধ্যমে সীতাভোগ  ও মিহিদানার জি.আই.স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানায়,এই আবেদনের সজ্ঞে যোগকরে দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৫ই নভেম্বর  রেডিও আকাশবাণী তে প্রচারিত বধ'মানের বিশিষ্ট মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী নগেন্দ্র নাথের একটি সীতাভোগ ও মিহিদানাকে নিয়ে প্রতিবেদন।অবশেষে সেই প্রচেষ্টা স ফল হলো।
                         ২০১৭ তে  জি.আই.স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে সীতাভোগ মিহিদানা বধ'মানের ভোগলিক পরিচয়ে স ররকারী পরিচিতি লাভ করলো,এই ' জি আই লোগো' থাকার কারনে অনান্য জেলায় বা রাজ্যে এই মিষ্টান্ন দুটির বধ'মানের নাম ব্যবহার করতে হলে তা আইন মেনে ক রতে হবে,এতে সব'ত্র সীতাভোগ  ও মিহিদানার গুনগত মান বজায়থাকবে।
সে বছর ভারত সরকারের জি. আই. বা জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকশনের স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়ল।


জানেন কি বাংলার কোন স্কুল রবিবারও খোলা থাকে?

স্বদেশ প্রেম আর ব্রিটিশ বিরোধীতার আদর্শ অনুসরন করে আজো রবিবার ক্লাসচালু থাকে গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে।

                                                           

বর্ধমান-হাওড়া কর্ড লাইনের উপর জৌগ্রাম স্টেশন থেকে উত্তরে আমড়া মোড়,নূড়ির মোড় ধরে দুই থেকে তিন কিলোমিটার গেলেই মেমারী রোড়ের ধারে অবস্থিত এলাকার সুপ্রাচীন এক শিক্ষ্যা প্রতিষ্ঠান_ গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।বিদ্যালয়টির গঠন-পঠন-পাঠন সব দিক থেকে অনান্য বিদ্যালয় গুলির মতোই স্বাভাবিক,কিন্তু নিজস্ব বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যে এই বিদ্যালয় যেন সারা দেশে এক ব্যতিক্রমী  নজিড় সৃষ্টি করেছে।ব্রিটিশ সরকার এখন আর এ দেশে না থাকলেও তাদের চালু করা প্রথা অনুসরন করে আজো আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রবিবার বন্ধ রাখা হয়,কিন্তু গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে আজো রবিবার ক্লাস চালু থাকে,যা এই প্রথাগত ধারনার বাইরে থেকে এই বিদ্যালয় কে একটা আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।অবশ্য এর প্রেক্ষাপটে রয়েছে স্বদেশ প্রেম আর তীব্র ব্রিটিশ বিরোধীতের ঐতিহ্যের ধারা।
          ভারতবর্ষ  তখন পরাধীন।১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে জাতীয় ক ংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী  অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব পেশ করেন।এই অসহযোগ আন্দোলনের ইতিবাচক বা গঠনমূলক কর্মসূচিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন। দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ঘোষণা  করলেন,"শিক্ষা অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু স্বরাজের আর অপেক্ষার সময় নেই।"দলে দলে শিক্ষকেরা পদত্যাগ করতে লাগলেন,সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি থেকে দিনের দিন ছাত্রের সংখ্যা কমে যেতে লাগলো।
অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ার তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলায়।আর এই আন্দোলন কে সফল করে তুলতে নিজের নিজের সাধ্যমত আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে আপামর বাঙালি। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বধ'মান জৌগ্রামের নিকট প্রতিষ্ঠিত হয় গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধান উদ্যোগী ছিলেন অবিনাশচন্দ্র হালদার মহাশয়,তিনি নিজের দান করা জমিতে প্রথমে যখন বিদ্যাল য় প্রতিষ্ঠা ক রেন তখন  ছিল খড়ের এক টি আটচালা।গোপালপুর গ্রাম বাসীর আরাধ্যদেবতা মা মুক্তকেশীর নাম অনুসারে বিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় 'গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় '। অবিনাশচন্দ্র হালদারের সজ্ঞে সহযোগীতায় ছিলেন বিজয় কৃষ্ণকুমার,রাজবল্লভ কুমার,ভূষণ চন্দ্র হালদার প্রমুখগণ।
                 বিদ্যালয়ের সহঃ শিক্ষক নাজিবর রহমান জানালেন,  "বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম রেজোলিউশনে কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ বিরোধীতার তীব্র প্রমান রুপে রবিবার বিদ্যালয়ের পঠন পাঠন চালু থাকবে সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে আজো আমাদের বিদ্যালয় রবিবার খোলাথাকে,এবং রবিবারের পরিবতে' সোমবার ছুটি থাকে।"
               বিদ্যালয়ের আরো কিছু সহঃ শিক্ষক পূণ'চন্দ্র মাজি,রাজীব রাহা,দেবব্রত রায়,লাল্টু কোলে,সৌরভ সরকার,ও সহঃ শিক্ষিকা তাঞ্জিলা খাতুনেরা জানালেন, "তখন বাংলার সমস্ত স্কুলকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিনিতে হতো,কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় ছিল ইংরাজী ভাষা ও ব্রিটিশ বিরোধীতাকরে প্রতিষ্ঠিত সম্পূণ' বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়।কিন্তু এটা ব্রিটিশ  সরকার মেনে নিতে পারলোনা,ফলে আমাদের বিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দিল না কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।এমন এক ঐতিহ্যময়  বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা  করে আমরা সত্যি গবি'ত।
             গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় শুধু তার ঐতিহ্যকে টিকিয়েই রাখেনি,চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে চাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সামাজিক জ্ঞান ও দায়ীত্ববোধের সঞ্চার ঘটিয়ে এবং প্রথাগত শিক্ষযগত যোগ্যতার উচ্চসীমায় পৌছে দেওয়ার মহান ব্রত আজো সে দায়ীত্ব সহ কারে পালন করে যাচ্ছে।বর্তমানে এখানে কারগরি শিক্ষারও ব্যবস্থা চালু হয়েছে।এই বিদ্যালয়ের অসংখ্য প্রাত্তন ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত,সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই বিদ্যালয়েরই প্রাত্তন ছাত্র ছিলেন।

               শত বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে এই বিদ্যালয় আজো তার ধারাকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে।১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইংরাজী পড়াবার অনুম তি পায়,এবং ১৯৬৪খ্রিষ্টাব্দেউচ্চ মাধ্যমিক স্তরেউন্নিত এই বিদ্যালয়ের চাত্র ছাত্রীর স ংখ্যা বত'মানে প্রায় তেরোশো।এক কথায় নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারাকে আজো বজায়রেখে গোপাল পুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় শুধু বাংলায় নয় ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির মধ্যে একটা নিজস্ব পরিচিতি লাভ করেছে গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।

লেখা ও ছবি ঃফিরোজ আলি কাঞ্চন

বিঃদ্রঃ লেখাটি এই সময় পত্রিকার বর্ধমান সমাচার পৃষ্ঠায় প্রকাশিত,এখানে কিছুটা পরিবর্তিত।এই লেখা ও ছবি কপি করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেয়ার করতে পারেন।

                     সাত দেউলিয়া আঝাপুর


           ফিরোজ আলী কাঞ্চন




বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য শিখর বা দেউল,যেগুলির নিজস্ব বৈচিত্র বিশেষত্বের দাবি রাখে।যেমন গৌরাঙ্গপুরের ইছাই ঘোষের দেউল,দেবিপুরের লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির,জৌগ্রামের জলেশ্বর মন্দির,দুর্গাপুরের রাঢ়শ্বর শিব মন্দির,মাইথনের ক ল্যাণেশ্বরী মনন্দির,বরাকরে দামোদর নদের তীরে পাঁচটি দেউল মন্দির ছিল,বর্তমানে চারটি অবশিষ্ট আছে এগুলি একত্রে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির নামে অভিহিত,প্রভৃতি।এই শিখর বা দেউল রীতির মন্দির গুলিকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়--রেখা দেউল,পিড়া দেউল,এবং বেগুনিয়া।আবার দেউল মন্দিরের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত,যথা--প্রথমত ' পিষ্ট ' বা তলপত্তন,এটি মন্দিরের মাটির নীচের ভীত অংশ।দ্বিতীয়ত,  ' বাড় ' এটি পিষ্ট ' র পর থেকে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের উপরের অংশ পর্যন্ত।তৃতীয়ত  ' গঞ্জী ', এই অংশভাগ সবথেকে দৃষ্টিনন্দন ; দেউলের যা কিছু সৌন্দর্য  ও বৈশিষ্ট্যাবলী তা এ অংশেই প্রকাশিত।আর সবের উপরের অংশকে বলা হয়, ' মস্তক '।
            জামালপুর থানার আঝাপুর মৌজার দেউল গ্রাম।নিহার রঞ্জন রায় তাঁর  ' বাজ্ঞালীর ইতিহাস ' গ্রন্থে এ গ্রামকে বলেছেন, ' সাত দেউলিয়া আঝাপুর '। শোনা যায় আগে নাকি এই গ্রামে সাতটি দেউল মন্দির ছিল,আর 'রাজারপুর ' থেকে নাম হয়েছে আঝাপুর।কিন্তু কোন রাজা সে সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বর্তমানে অবশিষ্ট একটি মাত্র মন্দির। উড়িশ্যার রেখ দেউল রীতির, পঞ্চ রথাকৃতি পঞ্চ দ্বারের,কৌনিক খিলানের, প্রায় ৯ফুট প্রস্তে ও ৮০ ফুট উচ্চতার এই অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনটি খ্রিষ্টিয় নবম-  দশম শতকে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়।
           পোড়া ইটের তৈরি  এই দেউল মন্দিরটি সামান্য হেলানো,এ প্রসজ্ঞে জৌগ্রামের কল্যাণ দাস মহাশয় শুনালেন এক সুন্দর কাহিনী, " আমাদের এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে যে, কোন এক মাতৃইভক্ত রাজা মাতৃ ঋণ শোধ করতে চেয়ে সাতটা মন্দির তৈরী করে দিয়ে মাতাকে বলেন, ' মা, এ মন্দির গুলি তোমাকে দিয়ে আমার মাতৃ ঋণ পরিশোধ করলাম '।পুত্রের এ হেন আচরণে মা অসন্তুষ্ট হলেন, মৃদু হেসে বললেন, ' মাতৃ ঋণ শোধ করা পুত্রের সাধ্যাতীত '।রাজা দেখলেন তার চোখের সামনে একের পর মন্দির ধসে পড়ে যেতে লাগল। তখন তিনি ভুল বুঝতে তেরে মায়ের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন,এবং শেষ মন্দিরটি যেটি ধসে পড়তে যাচ্ছিল সেটি উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিতে নিজের কণিষ্ঠ অজ্ঞুলি দিয়ে ঠেলে আটকালেন,মন্দির হেলে পড়তে পড়তে আর পড়ল না,সেই থেকে এই দেউল মন্দিরটি এমন ধারা হেলেই আছে। "

                   ঐতিহাসিকেরা মনে করেন পূর্বে এ স্থানটি ছিল জৈন তীর্থ ক্ষেত্র।পাল যুগের আগে বাঁকুড়া,পুরুলিয়া,বর্ধমান অঞ্চলে জৈন ধর্ম ব্যপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।এই দেউল মন্দিরের মধ্যে দেখা যায় অষ্টম জিন চন্দ্রপ্রভের শিলামূর্তি ও এক গাছের নীচে দ্বাবিংশ জিন নেমিনাথের পাষাণ বিগ্রহ।দেউলের কাছেই আছে অগর দিঘী নামে এক বিরাট জলাশয়। অনুমান করা হয়ে থাকে হরণ্য দেশ বর্তমানের হরিয়ানার অগ্রোত নামক এক গ্রামের বণিকরা ব্যবসা সূত্রে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল, এদের বলা হতো ' অগর বালা ',এই ব ংশের ই কোন ব্যক্তি এই দিঘী এবং দেউল মন্দিরটি নির্মান করে দিয়েছিলেন।
             ------------++--------+

                 

Wednesday, January 15, 2020

 লোক উৎসব টুসু
                   ফিরোজ আলি কাঞ্চন
ব্রাতজনের সংস্কৃতি হলো লোকসংস্কৃতি,লোক জীবনের কয়েক শত বা হাজার বছরের চর্চা ও চর্যার ফলে এক মার্জিত রুপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এখানে।এই লোক সংস্কৃতির নানা রুপ ও নানা আঙ্গিক,তবে রাঢ় বঙ্গে তথা দক্ষিণ বঙ্গে এর প্রধান-অপ্রধান অঙ্গ উপাঙ্গ গুলি সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বৈশিষ্ট্যময়। এখানে ধর্ম ঠাকুর,শীতলা,,মনসা প্রভৃতি লৌকিক দেব দেবী থান ও পুজার প্রচলন যেমন দেখা  যায় তেমনি পাওয়া যায় বাউল গান,কবি গান,লোটো,পঞ্চরস,ভাদ্র মাসে ভাদু আর পৌষ মাসে টুসু গান ইত্যাদি বহুবিধ লোক ঐতিহ্যের সন্ধান। 






                              টুসু লোক উৎসব,রাঢ বজ্ঞেপ্রাণের উৎসব।অখণ্ড বর্ধমান,বাঁকুড়া,পুরুলিয়া, মানভূম,সিংভূম অঞ্চলে বাউড়ি,মেটে,ক্ষেত্রপাল,মাহাতো,কুর্মি,মুণ্ডা,সাঁওতাল,ভূমিজ ইত্যাদি দ্রাবিড় অষ্ট্রিক ভাষা বর্গের মধ্যে ব্যাপকভাবে পূজিত হন এই অবৈদিক,অপৌরাণিক লোক দেবী।এমনকি ওপার বাংলার রাজসাহীতে রাজোয়াড় সম্প্রদায়ের মধ্যেও টুসু পরবের প্রচলন দেখাযায়।টুসু শব্দের নামকরণ কিভাবে হলো তা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের বিভিন্ন মত।অনেকে মনে করেন মধ্যপ্রাচ্যের প্রজননের দেবতা টেষুর নাম থেকে এসেছে টুসু,এদের মতে টুসু কুমারী নারীদের উপাস্য প্রজননের দেবী,আবার অনেকে বলেন ধানের 'তুষ' থেকে টুসু শব্দটি এসেছে,এদের মতে টুসু শস্য দেবী,আবার অনেক গবেষক মনে করেন তিষ্যা বা পুষ্যা নক্ষত্র থেকে টুসু নাম হয়েছে।
          শীতের আমেজে যখন  মুখরিত সারা বাংলা,তারই মধ্যে অঘ্রাহায়নের শেষদিন থেকে আরম্ভ এই উৎসবের।এই দিন মাঠ থেকে নতুন ধানের একটা গোছা মাথায় করে আনেন পাড়ার মেয়েরা,সন্ধ্যা হলে কুমারী মেয়েদের দল তুষের উপর রাখে আলো চাল,দূবা' ঘাস,সরষে,বাসক, আকন্দ প্রভৃতি ফুল।তার পর পাত্রটিকে হলুদ টিপ পড়িয়ে পিঁড়ির উপর  রেখে শুরু  হয় প্রতিদিনের সন্ধ্যা পূজা। পাড়ার কুমারী মেয়েরা রোজ সন্ধযায় একসজ্ঞে টুসু গান গেয়ে তাদের নিজস্ব সুখ দুখের প্রকাশ ঘটায়।পৌষ মমাসের শেষ চার দিনের প্রথম দিনকে বলা হয়ে থাকে চাউড়ি,এদিন বাড়িতে বাড়িতে তৈরী হয় চালগুড়ি,বাড়ির মেয়েরা গোবর মাটি দিয়ে উঠোন নিকায়,দ্বিতীয়  দিন বাঁউড়ি,এদিন বাড়িতে তৌরী হয় বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন রকমের পিঠে,এদিনের রাত জাগরনের রাত,সব বাড়ি আলোর সাজে সেজে উঠে,পাড়ার সব মেয়ের দল সারা রাত ধরে টুসুগান গায়।
             টুসু উৎসবের মূল আকর্ষন তার গানগুলি,গানের ভাষা যেমন সহজ সরল তেমনি প্রানবন্ত,গানগুলির বিষয় তাদের লোক জীবন থেকে উঠে আসা প্রতিদিনের হাসি কান্না,ব্যাথা বেদনা,সংসারের বিভিন্ন অনুভূতি,মেয়েলি বিবাদ,প্রভৃতি;শুধু তাই নয় নারী নিযা'তন,জাত পাত,কুসংস্কার প্রভৃতি সামাজিক সমস্যার কথাও এর বিষয়ে প্রবেশ করে থাকে।
                 শেষে পৌষসংক্রান্তির প্রত্যুষে টুসু দেবীকে সুসজ্জিত চর্তুদোলায় বসিয়ে গান গায়তে গায়তে নিয়ে গিয়ে নিকটস্থ নদী,দিঘী বা কোন পুকুরে দেওয়া হয় বিশর্জন।স্নান করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে মেয়েদের দল আবার গান গায়তে গায়তে ফিরে যায় গ্রামের পথে,এসময় এরা গানের মাধ্যমে এক দল অন্য দলকে আক্রমন করে_
                 "আমার টুসু নেয়ে এলো
                                   কি বা পড়তে দিবো গো?
                     ঘরে আছে বেনারসী
                                 তাই বার করে দিব গো।
                  ওদের টুসু নেয়ে এলো
                                    ওরা কিবা পড়তে দিবে গো?
                       ওদের ঘরে আছে ছিঁড়া ট্যানা
                                      ওরা তাই বার করে দিবে গো।
    
              টুসুগানে সমসাময়িক সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনৈতিক ভাবনারও প্রতিফলন লক্ষ করার মতো।টুসু গানের প্রাণ কেন্দ্র পুরুলিয়াতো আগে বিহার প্রদেশের সজ্ঞে যুক্ত ছিল,একদিকে বাংলার অনাগ্রহ আর অন্যদিকে বিহার সরকারের লাঞ্ছনা, সে ব্যাথা ছিল পুরুলিয়ার একান্ত নিজস্ব।সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল পুরুলিয়াবাসী,আর তাদের প্রতিবাদের ভাষা জুগালো তাদের মাটির সৃষ্ট প্রাণের গান টুসু গান।ভজহরি মাহাতোর,যিনি ছিলেল দক্ষীন মানভূম সংসদীয় আসন থেকে প্রথম সাংসদ,লেখা টুসুগান  "শুন বিহারী ভাই তোরা রাইতে লারবি ডাং দেখাই..."হয়ে উঠল পুরুলিয়া বাসীর প্রতিবাদী স্লোগান,উত্তাল হয়ে উঠল সমগ্র মানভূম।বিহার সরকার চরম দমন মূলক নীতি গ্রহন করে,ভজহরি মাহাতোকে গ্রেপ্তার করে কোমরে দড়ি বেধে আদালতে তোলা হয়েছিল।
        কালের প্রভাবে টুসু উৎসব তার গৌরব যেন হারাতে বসেছে,অতি আধুনিকতার আগ্রাসনে এখন এই টুসু উৎসবে যতো না গান শোনা যায় তার চেয়ে বেশি সোনা যায় যন্ত্র দানবের কন্ঠে ডিজে র তীব্র হুংকার,নতুন করে গান ও আর বাঁধা হয় না,' টুসু আমার ভাত খাবে লো আলুপোস্ত তরকারী ' এমন ধারা সহজ সরল মনের কথা আর নতুন করে টুসু গানে প্রকাশ পায় না,তবুও আজও গলসি,বুদবুদ,আউসগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে টুসু গানের সুর যখন মকর সংক্রান্তির দিন গ্রামের মেঠো পথে সরষে ফুলের ক্ষেতের ওপার থেকে শীতের শীতল বাতাসে ভেষে আসতে শোনা যায়,তখন মনে হয়, না রাঢ় বঙ্গ এখনো তার বেশেষত্বকে হাড়িয়ে যেতে দেয়নি।
--------------------------------
ছবি ঃঃচন্দন চক্রবর্তী(পুরুলিয়া)
বিঃদ্রঃ এই লেখাটি আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত।এখানে কিছু পরিবর্তিত।অন্য কোথাও এ প্রবন্ধ মুদ্রন বা প্রকাশ সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ

Sunday, November 10, 2019

বর্ধমান জেলায় মহরম


শোকের আবহে শান্তির বার্তায় মহরম

                          ফিরোজ আলী কাঞ্চন


মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে মূলত কোন বিভাগ না থাকলেও হজরত মহম্মদের(সাঃ)পরলোক গমনের পর ইসলাম ধর্ম সুন্নী ও শিয়া এই দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।সুন্নীর অর্থ সুন্নতের অধিকারী,যাঁরা নবিজীর নীতি ও আদর্শ অনুসরণ  করে তাঁরাই সুন্নী।বাংলার তথা ভারত বা পৃথিবীর প্রায় বেশির ভাগ মুসলমানই সুন্নী মতাবলম্বী।আর শিয়া শব্দের অর্থ দল।হজরত মহম্মদের(সাঃ) ইন্তেকালের পর খলিফা কে হবেন এই নিয়ে বিতর্ক দেখাযায়,নবিজীর জামাতা হজরত আলিকে  খলিফা হিসেবে সমর্থন করে শিয়া দলের উৎপত্তি।ইরাক,ইরান শিয়া অধ্যুষিত দেশ,ভারতের মুসলিমরা সুন্নি প্রাধান্য হলেও কিছু সংখ্যক শিয়া মতাবাদী মুসলিমও রয়েছে,হায়দ্রাবাদের সুলতান টিপুর বংশ,জিন্নাহ,বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লা প্রমুখগণ শিয়া ছিলেন।
     
   শিয়া ও সুন্নী উভয় মতাবলম্বী গণের কাছেই মহরমের গুরুত্ব অপরিসীম।পবিত্র কোরান অনুসারে আরবি বারোটি মাসের মধ্যে যে চারটি মাস আল্লাহ তলার কাছে সবচেয়ে সম্মানিত তার মধ্যে অন্যতম মহরম মাস।'মহরম ' প্রকৃতপক্ষে একটি মাসের নাম,তবে শিয়া ও সুন্নীদের কাছে এমাসের গুরত্ব আলাদা আলাদা।সুন্নীরা এ মাসে রোজা রাখে,দান-খয়রাত করে থাকে,অপরদিকে শিয়ারা রোজা রাখা বা দান খয়রাতের সাথে সাথে মহরমে তাজিয়া,লাঠিখেলা,মর্সিয়া গাওয়া ইত্যাদি অনুষ্ঠান করেথাকে,যা সুন্নীরা পছন্দ করেন না।স্বাভাবিক ভাবে সচেতন পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতেপারে আমাদের এখানের মুসলিমরা সুন্নী হয়েও মহরমে তাজিয়া বেরকরে, মর্ছিয়া গায় বা লাঠিখেলে কেন?আসলে এখানেই লুকায়িত আছে বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্যের ধারাটি,যা সকলকে আপন করে নেওয়ার।বাঙলায় ইসলামের আগমন ঘটেছে মূলত ইরান পারস্য হতে আগত পীর ওলী আউলিয়াদের মাধ্যমে,আর এই পীর আউলিয়ারা বাংলায় এসে এখানের সংস্কৃতির সজ্ঞে যেন মিশে গিয়েছিলেন।এ প্রসঙ্গে বলতে হয় মঙ্গলকোটের পীর হামিদ বাঙালীর কথা,সম্রাট শাহজাহানের আধ্যাত্মীক এই গুরু সুদূর পারস্য থেকে  এসে মঙ্গলকোটে আস্তানা গড়েছিলেন।প্রকৃত নাম ছিল হামিদ দানেশাখন্দ,কিন্তু তিনি ক্রমে বাংলাকে ভালোবেসে,বাংলার মাটি জল হাওয়ার সাথে গভীর একাত্মতাবোধে নিজেকে ' বাঙালী ' পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করতেন।তাইতো এইসব মহান ওলী আউলিয়াদের মাধ্যমে প্রচারিত ইসলাম এদেশে এসে হয়েউঠেছিল অনেক উদার।এখানের মুসলিমরা একদিকে যেমন শিয়া ও সুন্নীর সমন্বয় সাধন ঘটিয়েছে,তেমনি আবার বাংলার লোকায়ত ঐতিহ্যের ধারাকেও বজায়রেখেছে।আর নবিজীর আদর্শ ছিল এটাই,তিনি আরবের পূর্ব বর্তী সমস্ত জনজাতিকে নিয়ে এক অখণ্ড মানবতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, হজরত মহম্মদ (সাঃ) আমাদের দেশে আসতে পারেননি কিন্তু আরব,ইরান,পারস্যথেকে এই পীর আউলিয়াগণ সেই মানবতার বাণীই এখানে এনে যেন পৌছে দিলেন,সেই সূত্র ধরেই সুন্নী প্রধান এদেশেও মহরম মানে রোজা,দান ধ্যানের পাশাপাশি ' হায় -হোসেন, হায় -হোসেন 'প্রলাপে বুকফাটা ক্রন্দন।

'মহরম ' আরবি শব্দ,এর অর্থ পবিত্র বা সম্মানিত।ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসের নাম মহরম।বিশ্বাস অনুযায়ী এ মাসে পরম প্রভু আল্লাহতালা এই বিশ্ব জগৎ সৃষ্টি করেছিলেন,এই মাসে আদি পিতা হজরত আদম কে সৃষ্টি করেছিলেন এবং এই মাসেই স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে পৃথিবীতে পতিত হয়ে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর   আদিপিতা আদম ও মা হাওয়া পরস্পরকে দেখাপেয়েছিলেন;এছাড়া আরো একাধিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য ৬১হিজরী ১০ই মহরম- আশুরার দিন কারবালার প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর হাতে ইমাম হোসেনের মর্মান্তিক মৃত্যুর কাহিনী;এই বিষাদ গাঁথাকে স্মরণ করে মুসলিম সমাজ পরম ভক্তিভরে পালন করে থাকে শোকের পরব মহরম।
       মহরমের দিন রোজা রাখা হয়,গরিব মিসকিনদের বিতরন করা হয় চালের আটার পিঠে,হালুয়া সুজি,কোথাও পথিকদের জল পান করানো হয়,কোথাও বেরকরা হয় তাজিয়া,লাঠি খেলা হয়,মর্সিয়া গাওয়া হয়।হাসান,হোসেনের করুণ গাঁথাকে গাইতে থাকে মূল গায়ক আর বাকীরা বুক চাপড়ে বলতে থাকে ' হায় হোসেন,হায় হায়!!'।অনেকে আবার হাতের আঙুলের মাঝে রাখে ব্লেট আবার অনেকে পিঠি মারতে থাকে খঞ্জর। 
  কারবালার এই হৃদয়বিদারক কাহিনি অবলম্বনে কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন ' মহরম' কবিতা-"মহরম ! কারবালা ! কাঁদো হায় হোসেনা ! / দেখো  মরু - সূর্য এ খুন যেন শোষে না।"কবিতাটি ' মোসলেম ভারত ' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।মহরমের মর্সিয়ার করুন সুর যেন হৃদয় কে স্পর্শ করে।'মর্সিয়া' আরবি শব্দ,যার অর্থ শোক পেকাশ।মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে অনেক কবি ফারসি ও উর্দু মর্সিয়ার ভাবধারা অবলম্বনে বাংলা মর্সিয়া রচনা করে নিজস্ব স্বতন্ত্রতার পরিচয় দিয়েছেন,এঁদের মধ্যে হামিদুল্লাহ,মোহম্মদ খান,শাহ গরীবুল্লাহ,হিন্দু কবি রাধামোহন গোপ,মীর মোশাররফ হোসেন,হামিদ আলী,কায়কোবাদ,শেখ ফয়জুল্লা প্রমুখগণ উল্লেখ্যোগ্য।

       পূর্বেই বলা হয়েছে মুসলিম সমাজের আবার একটা অংশ এই লাঠি খেলা,তাজিয়া বেরকরা,মর্সিয়া গাওয়া বা খঞ্জর চালানোর বিরোধী,আর এক পক্ষ্য বলে মর্সিয়া গেয়ে,লাঠি খেলে,ধারালো খঞ্জরের আঘাতে রক্ত ঝরিয়ে যেন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মারাত্মক ও হৃদয় বিদারক ঘটনার সজ্ঞে নিজেদের একাত্মতা অনুভূত হয়েথাকে।ধু ধু মরু প্রান্তরে হোসেন পুত্র আলী আসগর একফোঁটা জলের জন্য ছটফট করতে থাকে,পিতার কাছে কচি সেই প্রাণ আধো আধো স্বরে বলতে থাকে ' আল-আৎশ!', ' আল-আৎশ!! ' অর্থাৎ পিপাসা,পিপাসা।চারিদিকে শত্রু সৈন্যে আবদ্ধ হোসেন নিজের জিহ্বা পুত্রের মুখে পুরে দিলেন,কিন্তু তাতে কি আর গলা ভিজে?দুধের শিশুকে কোলে তুলে হোসেন বাইরে বেড়িয়ে শত্রু সৈন্যদের কাছে শুধু পুত্রের জন্য একটু জলের প্রার্থনা জানালেন,বিনিময়ে ছুটে এলো তীর,বিদ্ধ আসগর কে ফিরিয়ে নিয়ে এসে হোসেন স্ত্রীর কোলে তুলে দিয়ে বললেন,'এই নাও তোমার পুত্র,ওর সারা জীবনের মতো তৃষ্টা মিটে গেছে,ও আর কোনদিন পিপাসা পিপাসা বলবে না।'এ প্রসঙ্গে বেগম রোকেয়া সাখাওত হোসেন লিখেছেন," এই যে মহরমের নিশান,তাজিয়া প্রভৃতি দেখা যায়,ঢাক ঢোল বাজে,লোকে ছুটাছুটি করে,ইহাই কি মহরম?...আচ্ছা তাহাই হউক;ঐ নিশান তাজিয়া লইয়া খেলাই হউক; কিন্তু ঐ দৃশ্য কি একটা পুরাতন শোক স্মৃতি জাগাইয়া দেয় না?বায়ু হিল্লোলে নিশানের কাপড় আন্দোলিত হইলে তাহাতে কি স্পষ্ট লেখা দেখা যায় না- 'পিপাসা '? "
           বর্ধমান জেলার  আসানসোল, বার্ণপুর,রাণীগঞ্জ,জামালপুর,কালনা,কাটোয়া,গলসির খেতুড়া,দয়ালপুর,দরবাপুর,বাহিরঘন্না সহ বিভিন্ন অঞ্চলে মহরমের তাজিয়া বের হয়ে থাকে,মূল বর্ধমান শহরে বি সি রোডে এক বিশাল শোক মিছিল বেড় হয়,কালাপাড়ি পীরের আস্তানা থেকে ঢাল বের হয়ে পুরো শহর পরিক্রমা করে। এ ছাড়াও পুরাতন চক, দুবরাজ দিঘী,ছোট নীল পুর,কুরমুন  চন্দনপুর, খাজা আনোয়ার বেড় এলাকা থেকেও ঢাল বের হয়ে থাকে।কয়েক বছর  আগে দূর্গাপুজো ও মহরম একই সময়ে পড়েছিল,গলসির চৌমাথার স্টার ক্লাবের পুজোমণ্ডপে খেতুড়া,বাহিরঘন্না গ্রামের ছেলেরা মহরমের মর্সিয়া গেয়ে এক সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।আবার সে বছর পুজো ও মহরম এক সঙ্গে হওয়ায় ঢাক ঢোল বাজনা নিজেদের মধ্যে ভাগকরে নিয়েছিলেন ভাতারের এরুয়ার কাজীপাড়ার মহরম কমিটি ও স্থানীয় পুজো কমিটির সদস্যগণ।আউস গ্রাম অঞ্চলের সিলুট বসন্তপুর গ্রামে মহরমে নাটক,যাত্রা,কবিতা আবৃতি,গজল,কেরাতপাঠের আয়োজন করা হয়ে থাকে।কয়রাপুর গ্রামে  মহরমে বিশেষ কিছু রীতি পালন করা হয়,গ্রামের বাছায় দশ জন ব্যক্তি ব্রত পালন করে থাকে,মহরমের চাঁদ উঠার এক দিন পর এই দশজনে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে মজ্ঞল কোটে গিয়ে সেখানে আধ্যাত্মিক গুরু ছোট হুজুরের কাছ থেকে দোয়া নিয়ে এসে মজ্ঞলকোটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন পীর আউলিয়ার মাজার পরিক্রমা করে আবার অন্যপথে পায়ে হেঁটে গ্রামে ফিরে এসে অবস্থান করে ইমামতলায়,এই ইমাম তলা হলো হাসান হোসেনের কল্পিত মাজার,এই কয়েকদিন ১০ই মহরম পর্যন্ত এই পালনকারীদের বাড়ির সজ্ঞে কোন সম্পর্ক থাকে না,এরা রোজারেখে থাকে,চুল, দাড়ি,নখ কাটা এই সময় গুলিতে নিষিদ্ধ;মহরমের দিন জ্বলন্ত আজ্ঞারের উপর  দিয়ে হেটে আগুন মাতম করা হয়ে থাকে।অনেক মুসলিম প্রধান গ্রামে আছে ইমামতলা,মহরম শেষে তাজিয়া এনে ইমাম তলায় রাখাহয়।

 এভাবে শোকের আবহে ধর্মীয় আধ্যাত্মীকতার সাথে সাথে শান্তির দৃষ্টান্ত রেখেছে মহরম।
                          -
লেখক গলসির শিক্ষক,সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মি

ছবি
গলসির খেতুরা গ্রামে মহরমের ইমামতলা