Friday, May 22, 2020



বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত

              ফিরোজ আলী কাঞ্চন


             জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রাধান্য ছিল মডারেট বা নরমপন্থীদের,এঁরা ব্রিটিশ সরকারে সজ্ঞে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পরাধীন দেশবাসীর আশা আকাঙ্ক্ষা পুরন করতে চেয়েছিলেন,কিন্তু কার্জনের বজ্ঞভজ্ঞ বিরোধী আন্দোলনের সময় নরম পন্থীদের সজ্ঞে চরম পন্থীদের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই দুটি ধারারই ব্যপক প্রভাব বাংলার অনান্য স্থানের সজ্ঞে সজ্ঞে বর্ধমান জেলাতেও পড়েছিল,অনেক তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ স্বাধীনের মহান ব্রতে,তেমনি একজন মহান বিপ্লবী, শহীদ ভগৎ সিং এর সহযোদ্ধা,বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী বটুকেশ্বর দত্ত।
          ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে বর্ধমান জেলার খণ্ডোঘোষের নিকট ওঁয়াড়ি গ্রামে বটুকেশ্বর দত্তের জন্ম।মাতা কমলা কামিনী দত্ত,পিতা গোষ্ঠবিহারী দত্তকে রেলওয়েতে চাকুরীসূত্রে সপরিবারে থাকতে হয়েছিল উত্তর প্রদেশের কানপুরে,১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে কানপুর মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হন,আর এই সময় পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচার ও শোষণ তাঁর চেতকে গভীর ভাবে উদ্বেলিত করে।বটুকেশ্বর দত্ত সহ যোগেশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,শচীন্দ্রনাথ সান্যাল,রামপ্রসাদ বিলমিস প্রমুখ বিপ্লবীদের মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হল ' হিন্দুস্থান রিপাবলিকান পার্টি '।
               পিতা-মাতা পুত্রের এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা মেনে নিতে পারলেন না,বটুকেশ্বর দত্তকে পাঠিয়ে দিলেন কলকাতায় ট্রেলারিং শিখার জন্য(১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দ)।কিন্তু এখানেও এই বিপ্লবী মানসিকতার কোন পরিবর্তন ঘটলো না,সংস্পর্শে আসেন কমিউনিষ্ট আন্দোলনের উল্লেখ যোগ্য ব্যক্তিত্ব মুজাফফর আহমদের,এবং তিনি যোগদান করের ভগৎ সিং,সুখদেব,ভগবতীচরণ ভোরা প্রমুখ বিপ্লবীদের ' নওজওয়ান ভারত সভা ' তে।সংগঠনের পক্ষথেকে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তর উপর দায়ীত্ব অর্পণ করা হলো লাহোরের অত্যাচারী ও ইংরেজ অফিসার স্যাণ্ডারসনকে হত্যা করার,এই কুখ্যাত অ্যাসিস্টাণ্ট সুপারিণ্টেণ্ড সাণ্ডারসনের নেতৃত্বেই দমন পীড়ন করে ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে ৩০ শে অক্টোবর লাহোরে সাইমন কমিশন বিরোধী আন্দোলনে পুলিশি লাঠিচার্জে শ্রদ্ধেয় জননেতা লালা লাজপৎ রায়ের মৃত্যু হয়েছিল,তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা জেগে উঠেছিল দেশপ্রেমী বিপ্লবীদের মনে,যে করেই হোক উপযুক্ত মোক্ষম একটা জবাব যেন দিতেই হবে।
            ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই ডিসেম্বর,লাহোরের কালেক্টর সাহেবের বাগান বাড়িতে প্রকাশ্য দিবালোকে বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিং বোমার বিষ্ফরণে ও গুলির গর্জনে ক্ষতবিক্ষিত করে দিল অত্যাচারী সাণ্ডারসনের দেহ, পুলিশের চোখ এড়িয়ে নিমিষে উধাও হয়ে দুজনে গিয়ে আত্মগোপন করলেন পাঞ্জাবের খাটকার নামক গ্রামে।কিন্তু এ স্থান নিরাপদ নয়,এদিকে সাণ্ডারসন হত্যা বিট্রিশ পুলিশের কাছে চরম আঘাত হানলো,লাহোর ষড় যন্ত্র মামলা দায়ের করে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের নামে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি করে তন্ন তন্ন করে খোঁজ চালাতে লাগলো বিভিন্ন বিপ্লবীদের গোপন ডেড়াগুলিতে।বটুকেশ্বর দত্তর কানপুরেও পুলিশের গোয়েন্দা নজর রাখছে,পাঞ্জাব,রাজপুতানা,উত্তর প্রদেশের নানা জায়গায় আত্মগোপন করে থেকে দুজনে চলে এলেন বটুকেশ্বর দত্তর দেশের বাড়ি জন্মস্থান ওঁয়াড়িতে,বাংলার দক্ষিণ দামোদরের কোল ঘেষে  নির্জন এই গ্রাম যেন সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী,পরাধীন ভারতের সবচেয়ে দীপ্ত দেশপ্রেমিক বিপ্লবী ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।এ প্রসজ্ঞে বলতে হয় কেন জানিনা আমাদের বর্ধমান জেলার অতীত অনেক কালথেকেই সারা দেশের রাজনৈতিক পটভূমিকার পরিবর্তনকারীদের বারবার আত্মগোপন করে থাকার আশ্রয় স্থান। মুঘল যুগে ফারুক শিয়র, শেরশাহ সহ অনেক ভারতের প্রধান চরিত্ররা এখানে গোপনে কাটিয়ে গিয়েছিলেন,তেমনি আবার চান্নাগ্রামে অগ্নিযুগের ব্রম্ভা স্বামী নীরালম্বের বা যতীন্দ্রনাথের আশ্রমে ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে গোপনে থেকেছিলেন রাসবিহারী বসু সহ অনেক বিপ্লবী। শোনাযায় জরুরী অবস্থার দিনগুলিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে নিরাপত্তার জন্য গোপনে রাখা হয়েছিল পানাগড়ে মেলেটারি ক্যাম্পে।মুঘল যুগে জেলাকে  'শরিফাবাদ ' বলা হতো,অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের বাসস্থান,মহাবীর বর্ধমানের পদধূলি ধন্য এ জেলার এ গৌরব  অখণ্ড বাংলা তথা সারা দেশের মধ্যে একটা নিজস্ব বৈশিষ্ট বলা যেতে পারে।
         কিন্তু স্বগ্রাম ওঁয়াড়িতে বটুকেশ্বর দত্তর করগেটের চাউনি দেওয়া মাটির দেওয়ালের  পৈত্রিক বাড়িটিও যেন নিরাপদ মনে হলো না,সংবাদ এলো পুলিশ তল্লাসিতে আসছে,বটুকেশ্বর বাড়ির পিছনেই প্রতিবেশী নগেন্দ্রনাথ ঘোষ ও খগেন্দ্রনাথ ঘোষেদের পাতালঘরে নিরাপদে আশ্রয় নিলেন দুই বিপ্লবী। পুলিশ এসেও কোন সন্ধান পেলো না,এ দিকে এই পাতালঘরের গভীর অন্ধকারে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বোমা নিক্ষেপের পরিকল্পনার ছক সাজিয়ে নিলেন।তিন দিন তিন রাত্রি পাতালঘরে কাটিয়ে পুলিশের ফিরে যাওয়ার পর ভগৎ সিং ও বটুকেস্বর দত্ত ছদ্মবেশে ওঁয়াড়ি গ্রাম ত্যাগ করলেন।
     ১৯২৯ সালের ৮ ই এপ্রিল, পার্লামেন্টে ব্রিটিশ সরকার আইন প্রণয়ন করে জন নিরাপত্তা বিল ও শিল্প সংক্রান্ত ট্রেডার্স ডিসপিউট বিল দুটি অনুমোদন করেনিতে চায়।এমন সময় দর্শক গ্যালারি থেকে নিক্ষিপ্ত হলো বোমা,ভয়ংকর বিষ্ফরণে কেঁপে উঠল চারিদিক, আইন সভার কক্ষ ধোঁয়ায় ছেয়ে গেল,আর ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তর কন্ঠে ধ্বনিত হল ভারতের রাজনীতির সেই দীপ্ত।স্লোগান, " ইনকিলাব -জিন্দাবাদ ",সেই সঙ্গে হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন বিল্পবীদের ইস্তেহার।বিনা বাধায় আত্মসমর্পণ করলেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর।শুরু হলো বিচারের নামে প্রহসন।বিপ্লবীদের পক্ষে আইনজিবী নিযুক্ত হলেন  আসফ আলী সাহেব।দায়রা বিচারক মিস্টার হিলটনের বেঞ্চে যুক্তিপূর্ণ সওয়াল করে আসফ আলী খান জয়ী হলেন,কিন্তু কুখ্যাত রাওলাট আইনের বিশেষ ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিস্টার হিলটন বিনা বিচারে ভগৎ সিং,রাজগুরু ও শুকদেবের ফাঁসী এবং বটুকেশ্বর দত্তর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করেন।
       ১৯৩০ থেকে পাঁচ বছর আন্দামানের সেলুলার জেলে ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচার সহ্য করতে না পরে বটুকেশ্বর দত্ত অসুস্থ্য হয়ে পড়েন,পরের দু বছর আলমোড়া এবং দিল্লী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কাটান,নজরবন্দী অবস্থায় পুলিশের চোখ এড়িয়ে বড়দাদা বীরেশ্বর দত্তর পাটনার বাড়িতে আত্মগোপন করে থাকতে লাগলেন।১৯৪১ খ্রিষ্টাবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বারোবছর পূর্ণ হলে তিনি নিস্কৃতি লাভ করেন।কিন্তু ১৯৪২ এর ভারতছাড়ো আমন্দোলনে আবার তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন,দায়ীত্ব নিলেন বিহারের।আবার তিনি বন্দী হলেন,এদিকে ভারতের রাজনীতিতে তাঁর বন্দীদশাবস্থায় ঘটে যেতে লাগলো বিশেষ বিশেষ পটপরিবর্তন,১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগষ্ট স্বাধীন হলো দেশ,দুঃখের বিষয় তখনো তিনি জেলে, এই বন্দীবস্থাতেই ১৮ই নভেম্বর বড়ো দাদা বীরেশ্বর দত্তর উদ্যোগে বটুকেশ্বর দত্তের বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়,প্রথম প্রধান মন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর বিশেষ অনুমতিতে পুলিশি ঘেরাটোপে বটুকেশ্বর দত্তর সেই বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শহিদ ভগৎ সিংয়ের মাতা বিদ্যাবতী দেবী।১৯৪৮ সালে সাজার মেয়াদ শেষ হবার পর তিনি দেওঘরে মেজদাদা বিশ্বেশ্বর দত্তর কাছে স্ত্রী অঞ্জলি দাসকে নিয়ে আশ্রয় নেন,এখানে কিছুদিন কাটানোর পর পাটনায় স্থান্তরিত হন।১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিহারের বিধান পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।কিন্তু শরীর যেন আর টানতে পারলো না,১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ শে জুলাই দিল্লীর ইণ্ডিয়ান মেডিকেল ইন্সিটিটিউডে ভগৎ সিং জননী বিদ্যাবতী দেবীর কোলে মাথারেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগকরলেন।শেষ ইচ্ছা অনু্যায়ী বটুকেশ্বর দত্তর মরদেহ পাঞ্জাবের ফিরোজাবাদে শহীদ ভগৎ সিংয়ের সমাধীর পাশে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাধীস্ত করাহয়।
            ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বর্ধমান জেলার ওয়াড়ি গ্রামের এই বীর সন্তানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থেকে যাবে চিরটা কাল
-------------------------------------------------------------

         

        
                 

Monday, May 4, 2020

      যাত্রা পালাকার ও নির্দেশক শ্রী ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়
                        
                          



ঈশাননাগর ঠাকুরের ' অদ্বৈতপ্রকাশ ' গ্রন্থে পাওয়াযায়-' শ্রীনাট মন্দিরে দেখি চৈতন্যের লীলা/অশ্রুনীরে ভাসি দেবী হইলা উতলা'। গবেষকগণ একমত যে গীতগোবিন্দ,শ্রীকৃষ্ণলীলা ও মহাপ্রভুর ভাববিহ্বলিত লীলামাহাত্বের প্রকাশের মাধ্যদিয়েই যাত্রাপালার উদ্ভব। এ সূত্রধরেই ডঃ সুকুমার সেনের অভিমত,' যাত্রা শব্দের মূল অর্থ হইতেছে দেবতার উৎসব উপলক্ষে শোভাযাত্রা ও উৎসব।'আবার ডঃ অজিত ঘোষ মনেকরেন,' মঙ্গল গান,লোক সঙ্গিত,পালা গান ইত্যাদি নানা ধারা বিবর্তনের মধ্যদিয়া সম্ভবত যাত্রাগানে রুপান্তরিত হয়েছিল।'

   ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেগেছেন,যাত্রায় ' লোক শিক্ষ্যে' হয়।যাত্রাপালা এমন এক মাধ্যম যেখানে একসাথে কয়েক হাজার হাজার একেবারে প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে বিনোদনের মাধ্যমে কোন বার্তা প্রেরণ করতে পারে, অন্য কোন বিনোদনের ধারায় সম্ভব নয়।বাংলার গ্রামে গ্রামে ধান কাটার পর গ্রাম্যকোন মেলা উপলক্ষ্যে কলকাতার পেশাদার যাত্রাপালার দলগুলির আগমন ও বড়ো মঞ্চে,চড়া আলোয়,চারিদিকে ত্রিপলে ঘেরায় হাজার হাজার দর্শক যেন দুচোখ ভরে একেবারে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করতো শহুরে রক্তমাংশের চকচকে অভিনেতা-অভিনেত্রিদের কণ্ঠের আভিজাত্য স্বর ও অনবদ্য অভিনয়।মাটিতে বসে বাদাম খেতে খেতে এই কয়েক দশক আগের যাত্রাপালার স্বর্ণযুগের সেই দিনগুলি আজ যেন ইতিহাস।

   বাংলায় যাত্রাপার উদ্ভবের ইতিহাস বহু প্রাচীন।চৈতন্য পূর্ববর্তী যুগে রামযাত্রা,সীতার বনবাস,শিবের গাজন প্রভৃতি কাহিনীর অভিনয়ের প্রথা প্রচলিত ছিল।শ্রী চৈতন্যের কৃষ্ণলীলার ভাববিহ্বলতার মাধ্যমে যাত্রাপালা লোকসমাজে ব্যপক জনপ্রিয়তা লাভকরে।গবেষকদের তথ্যঅনুযায়ী 'রক্ষিনী হরণ ' নামে এক কৃষ্ণপালায় স্বয়ং চৈতন্যদেব অভিনয় করেছিলেন।অষ্টাদশ শতক থেকে ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত যাত্রাপালায় মূলত ছিল পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর,ঊনবিংশ শতকের শেষের দিক থেকে দেশাত্মবোধক কাহিনী যাত্রাপালায় গুরুত্বপেতে থাকে।যাত্রাপালার ক্রমবিকাশের ধারায় ক্রমে প্রবেশ করে ঐতিহাসিক,সামাজিক,রাজনৈতিক কাহিনীর।

    দুঃখের বিষয় যে যাত্রাপালায় পেশাদার যাত্রাদলের মাধ্যমে একটা সময় বাঙালীর কাছে জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানে অবস্থান করেছিল,বর্তমানে যাত্রাপালার সেই স্বর্ণযুগ আর নেই।এখন বিনোদনের নানান মাধ্যম,যাত্রাপালার প্রাণকেন্দ্র যে প্রান্তিক গ্রামগুলি,সেখানেও আজ আধুনিকতার ছোঁয়া।কলকাতায় যে কটি পেশাদার দল টিকে আছে সেগুলির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন,গ্রামাঞ্চলে এমেচার যাত্রাদল গুলি শুধু শখের বসে আর যাত্রাপাগল কিছু মানুষের যাত্রার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় নিজেদের 'জেদ' বজায় রেখে আজও গ্রাম্যঅনুষ্ঠান গুলিতে যাত্রাপালার আয়োজন করেথাকে,তবে পোশাকের খরচ,মহিলা অভিনেত্রীর অভাব বা নতুন প্রজন্মের উদাসীনতায় এই প্রচেষ্টা এখন খুবই বাধা বিপত্তির মধ্যেও নিজেদের ধরে রেখেছে।এমেচার যাত্রাপালার পোশাক,বাদ্যযন্ত্র বা মহিলা অভিনেত্রী যোগানদেয় যে সংস্থাগুলি সেগুলিও যেন ধুকছে।হয়তো এভাবে চলতে থাকলে আর কয়েক প্রজন্ম পর লোকনাট্যের এই ঐতিহ্যময় ধারাটি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

         বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালার ধারাকে যিনি জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন এবং বাংলার সমস্ত সুধী যাত্রামোদী অভিনেতা,পরিচালক এবং দর্শকদের কাছে যিনি যাত্রাপালার ধারায় সরস্বতীর বরপুত্র,সেই অতি সুপরিচিত বিখ্যাত পালাকার শ্রী ভৈরব নাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে নবেম্বর বর্ধমান জেলার মুলগ্রাম নামক গ্রামে।ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের যাত্রাজগতে প্রবেশ 'নাচমহল ' পালা রচনার মাধ্যমে,তারপর আর কলম থেমে থাকেনি,একের পর এক তিনি যাত্রামোদী বাংলার দর্শক ও অভিনেতা অভিনেত্রীদের  উপহার দিয়েগেছেন বিখ্যাত বিখ্যাত সব যাত্রাপালা।

               সামাজিক,ঐতিহাসিক,পৌরাণিক সব ধারার পালাতে ভৌরবগঙ্গোপাধ্যায়ের ছিল অবাধ বিচরণ।সামাজিক নাটক গুলিতে প্রতিফলিত হয়েছিল সমাজের দর্পণ,এই পর্যায়ের বিখ্যাত নাটক গুলি হলো -' দেবী-সুলতানা ', 'লক্ষ্মীর পদচিহ্ন ', ' এক পয়সার মা ',পাঁচ পয়সার পৃথিবী ',' কান্না ঘাম রক্ত ','ময়লা কাগজ ', 'মা-মাটি-মানুষ ', ' ঘুম নেই', ' ভগবান বাবু ',' পদধ্বনি ','রক্তে রোয়া ধান ','জানোয়ার ','পরশপাথর ' ইত্যাদি।ঐতিহাসিক যাত্রাপালাগুলিতে ইতিহাসের কাহিনীর সাথে কল্পনার মিশ্রনে জাতীয়তাবোধ,দেশপ্রেম,ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ঘটিয়েছেন।দ্বন্দ্বের টানাপোরেনে ঐতিহাসিক পালাগুলি হয়েউঠেছে টানটান উত্তেজনাপূর্ণ।' বাঁদী লালবাঈ','বেগম আশমানতারা','দেবী মালিনী ','ফেরারী বান্দা' ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ঐতিহাসিক যাত্রাপালা।পৌরাণিক যাত্রাপালার মধ্যে উল্লেখ্য-'শাপ মুক্তি','স্বর্গ হতে বিদায় '।তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের 'গণদেবতা ' উপন্যাসকে তিনি যাত্রাপালার রুপ দিয়েছিলেন এছাড়াও ' অচল পয়সা','ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গ','বৌ হয়েছে রঙের বিবি','স্বর্গের পরে স্টেশন','পালকি ভাঙা বৌ','চিড়িতনের বিবি' প্রভৃতি যাত্রাপালার নামগুলি আজো গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষদের হৃদয়ে গেঁথে রয়েছে।
                আধুনিক যাত্রাপালার রুপকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় ১৯৯৮খ্রিষ্টাব্দে২৮শে ডিসেম্বর পরলোক গমন করেন।ভৌরব গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র দেবদূত গঙ্গোপাধ্যায় জানালেন,' পিতার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে যেন একটা স্বর্ণালী যুগেরও অবসান ঘটলো।'সত্যিই তাই একাধারে পালাকার,নির্দেশক,গীতিকার, সুরাকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের শূণ্যতা যেন আর পূরণ হবার নয়।বাংলার যাত্রামোদী সুধী সমাজের মনের মণিকোঠায় ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় অমর হয়ে থাকবেন চিরটাকাল।






       

ছবি
(ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবি দুটি ইনার পুত্র দেবদূত গঙ্গোপাধ্যায়ের সৌজন্যে প্রাপ্ত)
ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় এর মূল গ্রামে মূর্তি ও, মূলগ্রামে পালাকারের বসতভিটে

Saturday, May 2, 2020


অবিভক্ত বাংলায় প্রথম কারিগরি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন বর্ধমানের মহারাজা

       



   বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ বিজয়চাঁদ মহতাব যেমন ছিলেন সুদক্ষ শাসক, তেমনি ছিলেন প্রজাহিতৈষী ও প্রচণ্ড জনদরদী;সেই সঙ্গে  শিক্ষাদান ব্যবস্থায় আধুনিক প্রগতিশীল পরিকল্পনায় তিনি আবিভক্ত বাংলায় প্রথম কারিগরি বিদ্যালয় স্থাপনকরে এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।

      মোগল যুগ থেকে ইংরেজ আমল পর্যন্ত  হিন্দুস্থানের কেন্দ্রীয় শাসকদের সঙ্গে সর্বদা বর্ধমানের মহারাজাদের ছিল খুবই সুসম্পর্ক।পাঞ্জাবের লাহোরের কম্বল ব্যবসায়ী সঙ্গম রায় পুরীর তীর্থযাত্রা হতে ফেরার পথে বর্ধমান শহরের নিকট বৈকুন্ঠপুরে বসতি স্থাপন করেন ও ব্যবসা শুরু করেন।সঙ্গম রায়ের পৌত্র আবুরাম রায় দিল্লীর সম্রাট শাহজাহানের সৈন্যরা ঢাকায় বিদ্রোহ দমন করতে যাওয়ার পথে বর্ধমানে পৌঁছালে রসদ যোগানদিয়ে সহযোগিতা করেন,যার প্রতিদানস্বরুপ সম্রাট ফরমান জারি করে আবুরাম রায়কে চার হাজারী কতোয়াল এবং মুনসেফদারী পদ প্রদান করেন।পর্যায়ক্রমে এই পাঞ্জাবি বণিক পরিবারের বংশধরগণ দিল্লীর সম্রাটদের নিকট হতে জমিদারী ক্রয় করে নেন ও কীর্তিচাঁদের পুত্র চিত্রসেন রায় ' রাজা ' উপাধি প্রাপ্ত হন।
                   পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশ কোম্পানী বর্ধমানের খাজনা আদায়ের দাবি জানালে তৎকালীন বর্ধমানের রাজা অপুত্রক চিত্রসেনের খুল্লতাত মিত্রসেনের পুত্র তিলকচাঁদ রায় কোম্পানীর সঙ্গে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।কিন্তু পরাজয় অবসম্ভাবী বুঝে তিনি সন্ধি করতে বাধ্য হন এবং আনুগত্য স্বীকার করে নিয়ে কোম্পানীর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে রাজ্যপাট টিকেয়ে রাখেন।এ ভাবে পরবর্তীতে বহু বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করে-কখনো রাজনৈতিক অস্থিরতায় অস্ত্বিত্বের সংকট,কখনো বিদ্রোহ,যুদ্ধ,একাধিক মৃত্যু শোক,কখনো একেবারে রাজ অন্ত্য পুরে প্রবেশ করে শত্রুদের ধ্বংস ও হত্যালীলা,কখনো বা রাজ পরিবারের মধ্যেই ষড়যন্ত্র, একাধিক মামলা- মকদ্দমা প্রভৃতি বিপত্তির মধ্যদিয়েও দীর্ঘ সময় ধরে বর্ধমান বাসীকে সুশাসন দিতে সক্ষম হয়েছিল।বর্ধমান রাজাগণ বিভিন্ন রাজত্বে গ্রহন করেছিলেন একাধিক জনদরদী নীতি, প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অসংখ্য নান্দনিক সৌন্দর্য মণ্ডিত মন্দির,স্থাপত্য।পৃষ্ঠপোষকতা করেগেছেন অসংখ্য কবি,সাহিত্যিক এবং জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষ্যা প্রতিষ্ঠানের।
      মহারাজাধিরাজ বাহাদুর আফতাব চাঁদ(১৮৮১-১৮৮৫)ছিলেন আপুত্রক,তাঁর মৃত্যুর পর রাজকার্য পরিচালনা করতেন বিশ্বস্ত দেওয়ান বনবিহারী কাপূর।বিধবা মহিষী দত্তক নিলেন বনবিহারীর একমাত্র পুত্র বিজন বিহারী কাপূরকে,যিনি নতুন নাম গ্রহন করেন বিজয়চাঁদ মহাতাব এবং ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ১৯ অক্টোবর আইনি বাধা অতিক্রম করে মহা সমারোহের সাথে শাসনভার গ্রহন করেন।বিজয়চাঁদ হয়ে উঠলেন প্রজাদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠান  উপলক্ষ্যে বা দুর্বিক্ষে দীন দরীদ্র অসহায় প্রজাসাধারণকে অকাতারে বিতরণ করতে লাগলেন চাল ও বস্ত্র।এ হেন জনদরদী ও প্রজাহিতৈসী মহারাজাধিরাজের দৃষ্টি ভঙ্গি,  কার্য প্রণালী ও পদক্ষেপ গুলি যে কল্যাণকর হবে তা স্বাভাবিক।
     ১৮৮২ সালে ভারতের শিক্ষ্যা কমিশন দেশের শিক্ষ্যার মানের করুণ চিত্র তুলে ধরেন যে প্রচলিত ব্যবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষা গ্রহনের পরও সে শিক্ষ্যা শুধুমাত্র সরকারী চাকরী পাবার যোগ্য,তা জীবনের বাস্তব সমস্যাগুলি সমাধান করতে অক্ষম। বড়োলাট লর্ড কার্জন শিক্ষ্যা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে অবস্থার উন্নতি সাধনে সচেষ্ট হয়েছিলেন।কার্জন বিশ্ববিদ্যালয় গুলিকে পুনর্গঠন ও নিয়মিত পরিদর্শনের আদেশ দেন এবং স্কুল কলেজের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটান।তবুও অবস্থার তেমনকোন উন্নতি ঘটলো না।সারাদেশের সাথে বাংলারও ছিল একই সমস্যা,প্রথাগত পুঁথি নির্ভর শিক্ষ্যাব্যবস্থা শিক্ষ্যার্থীর চাকরী ছাড়া অন্যকোন কাজে লাগেনা,তা উপলব্ধি করে  সমস্যা সমাধানে হাতে কলমে কারিগরি শিক্ষ্যার প্রচলনে প্রথাগত শিক্ষ্যা ব্যবস্থার বিকল্প আধুনিক শিক্ষ্যা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করে সারা বাংলায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন বর্ধমানের মহারাজ বিজয়চাঁদ মহাতাব,যেটি বর্তমানে ' মহারাজাধিরাজ বিজয়চাঁদ ইনস্টিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড টেকনোলজি' নামে পরিচিত।বর্ধমান মহারাজা প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি অখণ্ড বাঙ্গের প্রথম কারিগরি বিদ্যালয়। স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত সারা বাংলায় কারিগরি বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি,এগুলির মধ্যে আমাদের বর্ধমানেরটিই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন,বাকী তিনটি ছিল ঢাকা,রাজশাহী ও পাবনায়।দেশ স্বাধীন হলে দুটি চলেযায় ওপার বাংলায়,এপার বাংলায় রয়ে যায় বিজয়চাঁদ প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানটি। 

      প্রসঙ্গ ক্রমে উল্লেখ্য মহারাজ বিজয়চাঁদ পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্বন্ধে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল ছিলেন,তিনি ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপ পরিভ্রমণ করেছেলিন, সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছিলেন-' ডায়েরি অফ অ্যান ইউরোপীয় ট্যুর ' নামে একখানি গ্রন্থ।আধুনিক শিক্ষা,স্বাস্থ্যসেবা,সমাজসেবা ও সাহিত্য সংস্কৃতি মূলক আয়োজনে বিজয় চাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা বাংলা তথা সারা দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছিল।১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে অষ্টম বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন বিজয়চাঁদের উদ্যোগে বর্ধমানে আয়োজিত হয়।কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতে তিনি অনুদান দেন,শুধু তাই নয় কলকাতা চিড়িয়াখানায় তাঁর অনুদান সুবিদিত। এছাড়াও তিনি রাঁচিতে আর্ট কলেজ নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।১৯০৪খ্রিষ্টাব্দে গর্ভনর জেনারেল লর্ড কার্জনের বর্ধমান আগমন উপলক্ষ্যে  নির্মাণ করেছিলেন ' কার্জন গেট ',যা বর্তমানে ' বিজয় তোরন ' নামে মূল শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঐতিহ্যময় স্থানরুপে বর্ধমানের গরিমা বৃদ্ধি করেআছে।বিজয় চাঁদের আর এক মহান কীর্তি ১৯০৭খ্রিষ্টাব্দে 'ফ্রেজার হসপিটাল ' প্রতিষ্ঠা, যা গ্রামীন স্বাথ্য পরিসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।এই হসপিটাল প্রতিষ্ঠায় তিনি তখনকার দিনে এক কালীন  ৮০হাজার টাকা এবং বার্ষিক সাড়ে বারো হাজার টাকা অনুদান দেন।তৎকালীন বাংলার গভর্নরের এনড্রু ফ্রেজারের নাম অনুসারে তিনি হসপিটালটির নাম করণ করেছিলেন,এই ফ্রেজারকে একবার তিনি কলকাতার এক মিটিং হলে এক সংগ্রামী বিপ্লবীর ছোড়া গুলিথেকে প্রাণে বাঁচিয়ে ছিলেন,সেই থেকে সখ্যতা গভীর হয়েছিল।এছাড়াও ১৯৮১ সালে বিজয়চাঁদ চালু করেছিলেন ' রোনাল্ডসে মেডিক্যাল স্কুল ',এ খানে চিকিৎসকদের প্রসূতিসেবার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো,স্কুলটি চালু ছিল ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। 
   বিজয়চাঁদ প্রতিষ্ঠিত বাংলার প্রথম কারিগরি প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নাম ' এম.বি.সি.ইনস্টিটিউট-অব ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড টেকনোলজি ',১৮৯৩খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে যখন শহরের পুরাতনচক এলাকায় প্রতিষ্ঠানটি প্রথম গড়ে উঠেছিল তখন নাম ছিল ' ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড টেকনিক্যাল স্কুল অব বর্ধমান '।তার পর একাধিকবার স্কুলটির অবস্থান পরিবর্তন ঘটে,পুরাতন চক থেকে উঠে যায় সদর থানার সামনে যেখানে এখন উদয়চাঁদ গ্রন্থাগার আছে সেখানে,ওখান থেকে উঠে আসে বর্তমান অবস্থানে সাধনপুরে মহারাজদের অতিথিশালা ' ডি বার্জ ' হাউসে।
   বিজয়চাঁদের কারিগরি শিক্ষা প্রচলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রজাসাধারণের সন্তানেরা যাতে আধুনিক বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত হয়ে স্বনির্ভর হতেপারে।এই কারিগরি প্রতিষ্ঠানটির ব্যায়ভার বহন করতেন বিজয়চাঁদ,আর কিছু অর্থ অনুদান দিত বেঙ্গল গর্ভমেন্ট, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড ও মিউনিসিপালিটি। বর্ধমান গবেষক নীরদবরণ সরকারের 'বর্ধমান রাজ ' গ্রন্থ হতে জানাযায় এই কারিগরি বিদ্যালয়ে প্রবেশের শিক্ষাগত প্রাথমিক যোগ্যতার মান ছিল এম.ই.(ষষ্ঠ শ্রেণি)।প্রথমদিকে ছাত্র সংখ্যা ছিল খুবই অল্প।এই স্কুলে ১৯২৮খ্রিষ্টাব্দে চালু করা হয়েছিল চার বছরের জুনিয়র মেকানিকাল পাঠক্রম।
      প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা সহজ,বরং তা পরিচালনা করা কঠিন।১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে বিজয়চাঁদ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিদর্শনের জন্য এক কমিটি গঠন করেন,কোন স্কুল কলেজের শিক্ষাদানের মানের অবনমনের সংবাদ পেলেই তিনি পরিদর্শন কমিটির অনুসন্ধান তথ্য পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহন করতেন।একবার তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির গুণগত মানের যাচাইয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে জেলার পুরো শিক্ষাকাঠামোটাই বদলে ফেলতে চেয়েছিলেন।বয়স্ক প্রধান পণ্ডিতদের অবসর দিলেন,নবীন শিক্ষকদের কড়াভাবে সচতেন করলেন।যেসব অধ্যক্ষরা অযোগ্যবলে বিবেচিত হলেন তাঁদের বিদালয়ে বদলি করলেন এবং বিদ্যালয়ের যোগ্য শিক্ষকদের অধ্যাপক পদে পাঠালেন।রাজস্কুলের পড়াশুনার মান সবচেয়ে নীচে নেমে গিয়েছিল,এ নিয়ে মহারাজ অসন্তুষ্ট প্রকাশ করলেন।শুধু তাই নয়,তিনি অভিভাবক ও ছাত্রদেরকেও সতর্ক করেন।যে সব বিদ্যালয় অবৈতনিক ছিল সেগুলিতে মাসিক বেতনের ব্যবস্থা করলেন,যুক্তি ছিল পয়সা খরচকরে পড়লে ছাত্র ও অবিভাবদের ভালো ফল করার তাগিদ থাকবে,সেই সঙ্গে বিজয়চাঁদ পুরস্কার স্বরুপ যে ছাত্ররা খুব ভালো ফল করবে তাদের সম্পূর্ণ বিনা বেতনে এবং যারা মাঝারি ফল করবে তাদের অর্ধবেতনে পড়ার সুযোগ দিলেন।শিক্ষার প্রসারে ও শিক্ষার মানের উন্নতি সাধনে বর্ধমান মহারাজের এ সব নতুন ধরনের চিন্তা ভাবনা, পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে।
     মহারাজের তত্বাবধানে পরিচালিত টেকনটিক্যাল স্কুলটিতে প্রথমদিকে পড়ানো হতো তিন বছরের ' আর্টিজেন কোর্স ',ছিল লোয়ার সাব অর্ডিনেট পাঠক্রম,চালু হয়েছিল সাব ওভার সিয়ার পাঠক্রম।ক্রমে ' ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড টেকনটিক্যাল স্কুল অব বর্ধমান ' এর খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে,১৯৪৪খ্রিষ্টাব্দে বাংলার গর্ভনর মিঃ ক্রেসী সে কথা স্বীকার করেছিলেন।দেশ স্বাধীনের পর১৯৫০খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠাটি সাধনপুরে স্থান্তরিত হয় এবং নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'মহারাজাধিরাজ বিজয়চাঁদ ইনস্টিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড টেকনোলজি '।১৯৭৭খ্রিষ্টাব্দে এটি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বিকৃতী পায়।বর্তমানে ডিপ্লোমা স্তরের এই টেকনিক্যাল কলেজটি কেন্দ্রের ' অল ইন্ডিয়া কাউন্সিল অব টেকনিক্যাল এডুকেশন' অনুমোদন প্রাপ্ত। এভাবে ১২৫ বছর অতিক্রম করে বর্ধমানের মহারাজাধিরাজ প্রতিষ্ঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রাচীন এবং স্বাধীন ভারতে পশ্চিম বঙ্গের সর্ব প্রথম প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ' এম.বি.সি. ইন্সটিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং এণ্ড টেকনোলজি ' কলেজটি বর্তমানে পূর্ব ভারতের অন্যতম কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রুপে বিবেচিত।

---------------------------------------

সংযোজন ঃ আফতাবচাঁদ মহাতাব ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র ১৯ বছর বয়সে বর্ধমানের রাজ সিংসনে বসেন,১৮৮১ তে সাবালক প্রাপ্ত হয়ে রাজ্যভার গ্রহণ করেন।খুব অল্পকাল ছিল ইনার সময়সীমা।১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দ ২৫ শে মার্চ ইনার মৃত্য হয় অপুত্রক অবস্থায়।
      মহারাজের বিধবা পত্নী দত্তক নেন বিজয়চাঁদ মহাতাবকে,বিজয় চাঁদের জন্ম ১৯ অক্টোবর ১৮৮১।মৃত্য ২৯ আগষ্ট ১৯৪১
       ১৮৯৩ এর এপ্রিলে বিজয়চাঁদ পুরাতন চকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ' ডিস্ট্রিক্ট বোর্ড টেকনিক্যাল স্কুল অব বর্ধমান '--এটিই বাংলার প্রথম ও একমাত্র কারিগরি বিদ্যালয় ছিল
         এই প্রতিষ্ঠানটি পরে প্রথমে সদরত থানার সম্মুখে ও পরে সাধনপুরে স্থানান্তরিত হয় এবং পরবর্তীতে বিজয়চাঁদের নামে রুপান্তরিত হয়।
তথ্যসূত্রঃ
 ★বর্ধমান রাজ ইতিবৃত্তঃশ্রী নীরদবরণ সরকার
★বর্ধমান রাজ ঃ আব্দুল গণি খান
★বর্ধমান চর্চা ঃ বর্ধমান অভিযান গোষ্ঠী 

      

   

     
    






         অরণ্যসুন্দরী ভাল্কি মাচান
     
                                                   ফিরোজ আলী কাঞ্চন

গ্রীষ্মের ধূ-ধূ ধরন হোক বা শীতের হালকা রোদ্দুরের কোমল আমেজ অথবা বর্ষার বৃষ্টিধোয়া সবুজের সমারোহে ;সব ক্ষণে সব ঋতুতে আমাদের সুদূর পিয়াসী মন পেতে চায় প্রকৃতির স্পর্শ,প্রবেশ করতে ইচ্ছে করে গভীর গহনে; তা একাকী নির্জনে হোক বা প্রিয়জন-পরিবারের সাথে। সেই আহ্বানেই একদিন দেখে আসতে পারেন শান্ত নির্জন প্রকৃতির মধ্যে পাখিদের কলতান আর শাল,পিয়াল গাছালির সারির গভীরের নিস্তব্ধ পরিবেশে মোড়া পূর্ব বর্ধমান আউসগ্রাম থানা অঞ্চলের অরণ্যসুন্দরী ভালকি মাচান।প্রাচীন এই জঙ্গলকে নিয়ে স্থানীয় গ্রামগুলির জনগণের মধ্যে প্রচলিত আছে অদ্ভুত সব রোমাঞ্চকর রূপকথা।
            জঙ্গল নিকটস্থ প্রাচীন জনপদ অমরারগড় ছিল গোপ রাজাদের রাজধানী। লোকশ্রুতি এই গ্রামের এক পূর্ণগর্ভা সদগোপ মহিলা জঙ্গলের ধারে এক পুকুরে জল আনতে গিয়ে ভাল্লুকের দ্বারা আক্রান্ত হয়,ভাল্লুক গগর্ভবতী মহিলাকে টেনে নিয়ে যায় বনের মাঝে নিজের বাসায়;সেখানে সে মহিলাটিকে ভক্ষণ করে,সেই সজ্ঞে গর্ভবতী মহিলাটির শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়।ভাল্লুকটি কিন্তু সেই শিশুর কোন ক্ষতি করে না।পরেরদিন এক ব্রাম্ভণ জজ্ঞলের সেই পথ ধরে যাচ্ছিলেন।হঠাৎ ঝোপের আড়ালথেকে শিশুর কান্না শুনে তিনি থমকে দাঁড়ালেন।সর্তপনে এগিয়েগিয়ে দেখলেন এক সদ্যজাত,পরম  মমতায় বুকে তুলে এনে তিনি সেই শিশুটিকে বাড়ি ফিরে এসে গিন্নির আঁচলে তুলেদিলেন।ব্রাম্ভনের স্ত্রীর কোন সন্তানাদি ছিল না,তাই তার মাতৃস্নেহ যেন উথলে উঠল।ব্রাম্ভনীর কাছেই বড়োহয়ে উঠল ছেলেটি।ভালুকের বাসাথেকে পাওয়া গেয়েছিল বলে এর নাম রাখাহয়েছিল ভাল্লুপাদ।এই ভাল্লুপাদ পরে এই অঞ্চলের রাজা হয়েছিল,ইনি ছিলেন গোপ রাজাদের পূর্বপুরুষ। 'পাদ ' অর্থ পূজনীয়,চর্যাপদের কবিদের নামে শেষে যেমন 'পাদ ' থাকে সেই অর্থে।
       আবার অনেকে বলেন এক ভাল্লুকী এই জজ্ঞলের মধ্যে এক মানব সন্তান কুড়িয়ে পায় এবং সে মাতৃস্নেহে শিশুটিকে বড়ো করে তুলে।পূর্ণ বয়েসে শুশুটি হয়েউঠল ভাল্লুকের মতো বীর ও শক্তিশালী। ভাল্লুকের স্তন্যপানে শিশুটি বড়োহয়ে উঠেছিল বলে নাম হয়েছিল ভাল্লুপাদ,এবং পরে তিনি এই অঞ্চলের রাজা হয়েছিলেন ও এক সদগোপ কণ্যাকে বিবাহ করেছিলেন। আবার অন্যমতে ভাল্লুপাদর পা গুলোছিল ভাল্লুকের পায়ের মতো,ইনি ছিলেন রাজপুত সন্তান।বিকৃত পা নিয়ে জন্মানো এমন সন্তান কে তার পরিবারের লোকেরা লোকলজ্জার ভয়ে জঙ্গলে ফেলেদিয়ে আসে এক ভাল্লুকের গর্তে।কিন্তু এক নিঃসন্তান ব্রাম্ভন শিশুটিকে কুড়িয়ে পেয়ে বাড়ি নিয়ে এসে লালন পালন করেন।
          প্রকৃত ঘটনা যা হোক না কেন,এই জজ্ঞলে এক কালে যে প্রচুর পরিমানে ভাল্লুকের বাস ছিল এ কথা নিশ্চিত।বর্ধমানের মহারাজেরা এই জজ্ঞলে ভাল্লুক শিকার করতে আসতেন।আজো এখানে দেখতে পাবেন একটা পোড়া ইটের তৈরী ভগ্নপ্রায় টাওয়ার বা মাচা,যা এ জজ্ঞলের এক বাড়তি আকর্ষণ।এই মাচার নীচে আছে এক সুড়ঙ্গ, জনশ্রুতি এই সুড়ঙ্গের সঙ্গে নাকি বর্ধমানে শাহাচেতনপুরের শের আফগানের সমাধির নিকট অবস্থিত সুড়ঙ্গ পথের যোগাযোগ রয়েছে।আসলে প্রাচীন যুগথেকে মাটির নীচে সুড়ঙ্গ পথের একটা যোগ বর্ধমান জেলায় পাওয়া যায়,দুর্গাপুরে সিটি সেন্টারের নিকট ভবানীপাঠক দেবীচৌধুরানী পূজিত মন্দিরের নিকটেও এক সুড়ঙ্গ দেখতে পাওয়া যায়,এগুলি কোন একসূত্রে যুক্ত কিনা তার কোন অনুসন্ধান এখনো পর্যন্ত হয়নি।


অরণ্যসুন্দরী ভাল্কি মাচানের গভীর নিস্তব্ধতায় প্রাকৃতিক পরিবেশের মনোরম সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই।প্রতিবছর শীতকালে এখানে পিকনিক করতে দূর দূরান্ত থেকে আসে পর্যটকদের দল।মাচানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে নির্মিত হয়েছে একটি পার্ক,মাচানের প্রবেশমুখে প্রতিষ্ঠিত এক ভাল্লুকের মূর্তি,যদিও এখন আর ভাল্লুকের দেখা মেলেনা।পার্কের মাঝে এক বড়ো দিঘী,এখানে বোটিংয়ের ব্যবস্থা আছে।হরেক ফুল আর ঝাউগাছের সারিদিয়ে ঘেরা দিঘী এ অরণ্যের মাঝে যেন এক আলাদা নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।এ অঞ্চলের বিরাট বনভূমি যেন শহুরে ইঁট পাথরের ব্যস্তময় একঘেয়েমি জীবনের নিকটেই এক টুকরো সবুজের সমারোহ,বনের মাঝে আবার আছে বিভিন্ন ছোট ছোট আদিবাসীদের গ্রাম।জঙ্গলে শালপাতা আর শুকনো কাঠ কুড়িয়ে যাঁরা জীবিকা নির্বাহ করে।

যে কোন ছুটির সময়ে আপনার সেরা গন্তব্য হতেপারে অরণ্যসুন্দরী ভালকি মাচান,আর রাত্রের নিঝুমে জজ্ঞলের শ্বাস প্রশ্বাসকেও যদি উপলব্ধি করার ইচ্ছে হয় তার জন্যে আছে'অরণ্যসুন্দরী রিসর্ট '। 
    ভাল্কি মাচান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই রয়েছে যমুনা দিঘী,আর এক পর্যটনক্ষেত্র।রাজা মহেন্দ্রনারায়ণ ও তাঁর স্ত্রী অমরাবতীর ছিল এক পুত্র যোগেন্দ্রনাথ এবং দুই কন্যা যমুনাবতী ও শৈবালিনী।রাজা মহেন্দ্র তাঁর স্ত্রী কন্যাদের খুব ভালোবাসতেন ও স্নেহ করতেন।স্ত্রী অমরাবতীর নামে তিনি তাঁর রাজধানীর নামকরণ করেছিলেন 'অমরারগড় ',এবং এই অমরারগড় গ্রামের নিকট দুইখানি বড়ো দিঘী খনন করেদিয়ে প্রজাদের কৃষিকার্যের জন্য ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিলেন।প্রজাহিতৈষি মহেন্দ্র নারায়ণ এই দিঘীদুটির নাম দিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যার নামে-যমুনাদিঘী ও শৈবালনী দিঘী যা অপভ্রংশ হয়ে 'শ্যাওলা দিঘী ',বর্তমানে দুটি দিঘীই একত্রে 'যমুনাদিঘী ' নামে পরিচিত।এই দিঘীদুটিকে কেন্দ্রকরে পশ্চিম্বঙ্গ সরকারের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে মৎস্যপালন দপ্তর ও পর্যটন ক্ষেত্র।এখানে গেলে পাবেন হরেক রকমের টাটকা মাছের বিভিন্ন পদ গ্রহণের সুযোগ।
    রাত্রিবাসের জন্য বেছেনিতে পারেন ভাল্কি মাচানের অরণ্যসুন্দরী গেস্ট হাউস,যোগাযোগঃ০৩৪৫২-২০০৬০৪ অথবা যমুনাদিঘী আম্রপালি গেস্ট হাউসেও থাকতে পারেন।কলকাতায় বিকাশ ভবনের স্টেট ফিসারিজ ডেভলপমেন্ট করপোরেশনের অফিস থেকে এখানে থাকার যোগাযোগ করা যায়।হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন নিকটেই দোকরাশিল্পের জন্য বিখ্যাত গ্রাম দরিয়েপুর।

   প্রকৃতির অপরূপত্বের  সুন্দরতম প্রকাশে যুগ যুগান্তর ধরে ধরিত্রীর বুকে ভাল্কি মাচানের এই অরণ্য মানব সভ্যতার সঙ্গে যেন জড়িয়ে রয়েছে গভীর আত্মীয়তার অন্তরঙ্গ বন্ধনে।আধুনিক ব্যস্তময় যন্ত্রসসভ্যতার পাশাপাশি কলকাতার নিকটে পাথুরে লাল মোড়াম মাটির এই দেশে পা ফেলে,বা বনের আরো গভীরে বৃক্ষশাখার পুষ্পসম্ভার,হরিত পর্ণ সম্ভারের দর্শনে,আর ঋতুচক্রের নিজস্ব বৈশিষ্টে অরণ্যসুন্দরীর নৈসর্গিক শোভার নৈকট্যে আমাদের মন  হয়েউঠে মুগ্ধ ও বিহ্বল।ঠিক মতো প্রচারপেলে এই অরণ্য পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রে অবশ্যই জায়গা করেনিবে।

পথনির্দেশঃকলকাতা বা বর্ধমান থেকে দুর্গাপুর হাইওয়ে ধরে গলসির পারাজ মোড় থেকে ডানদিকে ২২কিলোমিটার,ট্রেনে বর্ধমান স্টেশন থেকে আসানসোল লোকাল ধরে মানকর স্টেশনে নেমে ১০-১২ কিলোমিটার।
                             ____________________________




Friday, May 1, 2020

সুয়াতার পীর হজরত শাহ মাহমুদ বাহামানী



  শ্রীচৈতন্য দেবের উদার মানবতাবাদী ধর্মপ্রচারের ফল স্বরুপ বাংলার মাটি হয়ে উঠেছিল এক মহা মিলনের পীঠস্থান।আবার অন্যদিক থেকে বিভিন্ন মুসলমান পীর,ফকির,দরবেশ,ওলি-আওলিয়া,আউল-বাউলের আবির্ভাব এই মিলনের পথে যেন সেতু রচনা করে।তখন অনেক হিন্দু সাধকের যেমন মুসলমান শিষ্য ছিল যেমন, শ্রী চৈতন্য দেবের শিষ্য যবন হরিদাস;তেমনি আবার অনেক মুসলমান পীর ফকিরের কাছে অনেক হিন্দুও দীক্ষ্যা নিয়েছিলেন।বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের এই মিল মহব্বত সবচেয়ে সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল তুর্কি আক্রমনের পর।এ প্রসজ্ঞে বলতে হয় ' সত্যপীর ' এর কথা।সত্যপীর হলো হিন্দুদের সত্যনারায়ন  ও মুসলমানদের পীরের মিলিত রুপ। রাঢ়বজ্ঞের বিভিন্ন জেলার মুসলমানদের মধ্যে এখনো এই সত্যপীরের পালাগানের আসর বসে।আর হিন্দুরাও এই সত্যপীরকে সম্মান জানিয়ে সব ঠাকুরের বেলায় প্রসাদ  বললেও সত্যনারায়নের বেলায় সিন্নি বলে থাকে।সে যাই হোক বাংলার এই উদার মানসিকতা থেকেই এ সব পীর ফকিরদের বিভিন্ন অলৌকিক কেরামতির প্রভাবে ইনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ সব মহাত্মার ইহলোক ত্যাগের পরে  ইনাদের  মাজার জেয়ারত(বিশেষ প্রার্থনা)  করা হয়।মাজারে সিন্নি দেওয়া হয় বাতাসা খইচুড়। চড়ানো হয় সালু কাপড়ের চাদর।প্রতিদন সাঁঝ দেওয়া হয় প্রদীপ বা মোমবাতী ও ধুপ জ্বেলে।বছরের বিশেষ  দিনে পবিত্র উরসের আয়োজন করা হয়_এদিন থানে দেওয়া ভক্তদের মানতে দেওয়া মুরগী, হাস,ছাগল,আলু,কুমড়ো প্রভৃতি সহযোগে খিচুড়ি রান্না করা হয়;সেদিন হিন্দু মুসলমানের এক সাথে পাতপেড়ে থেতে কোন বাধা থাকে না।উসরস উপলক্ষে মেলা  বসে,সে মেলায় ফকিরি গান,কবি গান,বাউল গান,সত্যপীরের গানের আসর বসে।আমাদের ব্র্ধমান জেলাতেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন ব হু পীরের মাজার।তেমনই একজন বিখ্যাত পীর আউলিয়া হলেন হজরত বাহমান শাহ।
                    পুরো নাম হজরত শাহ মাহমুদ বাহামনী(রঃ)।আদি নিবাস বাহমান শহরে,তাই বলা হয় বাহমন শাহ।ইনি ছিলেন আরব উপদ্বীপের বিখ্যাত পীর হজরত শাহ জালালের অন্যতম শিষ্য।হজরত শাহ জালাল ইমন(ইয়েমন) দেশ থেকে শান্তি ও পবিত্রতার বাণী  প্রচারের উদ্দেশ্য  পদভ্রমনে বেড়িয়ে প্রথমে তিনি আরব থেকে ইরানে এসে পৌছালে অনেক ধম'প্রাণ সাধক তার সজ্ঞে যোগদেন,এদের মধ্যে ছিলেন আমাদের আলোচ্য বহমন শাহ,যিনি ইরানের সুখ্যাত নরপতি বাহমান-বিন-ইস্কান্দার এর বংশ বাহমনী বংশীয়।বহমান শাহ সাধনায় বাহমান শাহ সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে হজরত শাহ জালালের সজ্ঞে যোগদিয়ে ইরান থেকে আফগানিস্থান, কান্দাহার হয়ে হিন্দুস্থানে প্রবেশ করেন।দিল্লীর মসনদে তখন আলাউদ্দিন খলজি।
    বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে ঘটনাক্রমে বাহমান শাহ এসে হাজির হলেন গোপভূমে।এই গোপভূমের প্রাচীন জনপদ ভাল্কি অঞ্চলের সুয়াতা,জামতাড়া,প্রতাপপুর,অমরাগড় প্রভ্রতি অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ কে প্রচার করতে লাগলেন।জনশ্রুতি সে সময় এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল ভয়ংকর নরবলি প্রথা।পালি করে প্রতি বাড়ি থেকে একজন করে পুরুষ মানুষ পাঠাতে হতো বলির জন্য।বাহমন শাহ এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।এতে ভাল্কীরাজা মনিন্দ্র নারায়নের সজ্ঞে তার বিরোধ বাঁধে।দুপক্ষে তমুল যুদ্ধ হয়।রাজার বিশাল সৈন্যবাহিনীর কাছে বাহমন শাহ পরাজিত ও নিহিত হন।যেহেতু এই যুদ্ধ ছিল সাধারন মানুষের পক্ষনিয়ে সেহেতু এই যুদ্ধে বাহমন শাহের মৃত্যু হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই গভীর রেখাপাত করে।
               অনেকে বলেন গোপরাজাদের আরাধ্যদেবতা শিবাক্ষ্যা মন্দিরের নরবলি প্রথা বন্ধ করতে গিয়ে বাহমান শাহের সজ্ঞে রাজার দ্বব্দ্ব বেধেছিল, এবং এই সময় বাহমান শাহের মৃত্যুর স ংবাদ পেয়ে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ সৈন্য পাঠেয়ে ছিলেন ও পীরের মাজার বাধিয়ে দিয়েছিলেন ;সে হিসেবে তিনি হোসেন শাহের সমসাময়িক,(১৪৯৩-১৫১৯)।বাহমান শাহের মাজারে তিনটি শিলালিপি দেখলাম।তথ্য ঘেঁটে জানা গেল এগুলি আরবী তুঘরা লিপিতে লেখা।এর পাঠোদ্ধারও ক রা হয়েছে।এগুলির মধ্যে পাওয়া যায় ' পরম ন্যায় পরায়ন ও উদার সুলতান পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ধর্মপরায়ণ সুলতান আবুল মুজাফফর হুসাইন শাহ'র নাম।এছাড়াও কাজী মিনাজী বলে এক জনের নাম পাওয়া যায়,এবংউল্লেখিত সাল হলো হিজরী ৯০২(১৪৯৬-৯৭খ্রিষ্টাব্দ)। কিএই কাজী মিনাজী ছিলেন সমম্ভবত ভাল্কীর কাজীপাড়ার বাসীন্দা,ইনিছিলেন বাহমান পীরের ভক্ত;এবং হুসেইন শাহের ককর্মচারী, হয়তো ইনারই অনুরোধে সুলতান পীরের মাজার বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।
                    বাহমান।শাহ বা মোম্মান শাহের মাজারে বিশেষ বৈশিষ্ট আজো প্রত্যেকদিন সন্ধযায় ডঙ্কা বাজানো হয়।মাজারের প্রবেশ মুখের পাশেই আছে পীরপুকুর,এই পুকুরে স্নান করলে ভক্তের কামনা পূর্ণ হবে বলে বিশ্বাস।প্রতি বছর ১লা মাঘ এই পীরের বাৎসরীক উড়স উপলক্ষ্যে মাজার সংলগ্ন মাঠে এক বিরাট মেলা বসে,এটাকে অখণ্ড বর্ধমান জেলার সবচেয়ে বড়ো পীরের মাজার বলা যেতে পারে।বাহমান সাহেবের কেরামতি বা অলৌকিক কাহিনী সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে,পীরের মাজারে আগে গভীর রাত্রে ভাল্কির জজ্ঞল থেকে বাঘেরা সালাম জানাতে আসতো।এছারা শোনাযায় এক ধনী ব্যক্তি নতুন কেনা বন্দুকে এখানের শহীদস্থানের গাছে সর্বদা থাকা বকেদের মারলে মাজার কমিটির শজ্ঞে ঝামেলা বাধে,বিচারে ধনীব্যক্তির বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষযীদিতে সম্মতি না হলেও ঝাঁকে ঝাঁকে বকের দল বিচারসভায় উড়েগিয়ে হাজির হয়েছিল।হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে আজো খুবই জনপ্রিয় আউসগ্রাম থানার ভাল্কির কাছে সুয়াতাগ্রামের এই হজরত শাহ মাহমুদ মাহামানী সাহেবের মাজার।
(ফিরোজ আলি কাঞ্চন)







----+++++++++++++++++++++++++
ঐতিহ্যবাহী কালিকাপুর ও মৌখিরা
     ফিরোজ আলি কাঞ্চন
সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অতীত ঐতিহ্যের প্রতি আমাদের উদাসীনতা ও অবহেলা দেখে বাঙালীর ইতিহাস নাই বলে আক্ষেপ করেছিলেন,সেই আক্ষেপ আজও যেন আমাদের রয়েগেছে।আমরা রক্ষা করতে পারছিনা ইতিহাসের গন্ধ মাখা আমাদের ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ও স্থান গুলিকে।অথচ আমাদের জেলায় জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কতো প্রাচীন রাজবাড়ি,জমিদার বাড়ি,প্রাচীন মন্দির,মসজিদ,দেউল বা আরো প্রাচীন হাজার বছরেরো আগের বিভিন্ন ঢিবি থেকে প্রাপ্ত পোড়া মাটির প্রত্নতাত্বিক নিদর্শনময় স্থান গুলিকে। এ সবকে কেন্দ্র করে যদি ছোট খাটো পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায়,তাহলে একদিকে যেমন আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে সমৃদ্ধ তেমনি অতীতের ঐতিহ্যগুলিও রক্ষা পাবে।
    সুলতানী ও মুঘলযুগে বিশেষ করে গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের সময় বাংলায় বিভন্ন মসজিদ, মক্তব বা পীরের দরগা গড়ে উঠেছিল তেমনি   বিভিন্ন রাজা বা ব্রিটিস যুগে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলায় যে জমিদার শ্রেণির উদ্ভব ঘটেছিল সেই জমিদার ও জমিদারদের ছত্রছায়ায় থাকা দেওয়ান বা পদস্থ কর্মচারীরা গ্রামাঞ্চলে প্রভূত সম্পদের মালিক হয়ে উঠে নির্মান করেছিল বিশাল বিশাল সব অট্টালিকা ও টেরাকোটার কারুকার্যময় সব অসংখ্য মন্দির।বিশাল সেই অট্টালিকা গুলি জনসাধারনের কাছে জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ি নামে পরিচিত।অখণ্ড বর্ধমান জেলায় এ ধরনের বেশকিছু রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায়,যেমন - মূল বর্ধমান শহরে রাজবাড়ি বা রাজবাটি,যেটি এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যকরী ভবন রুপে ব্যবহৃত। এছাড়াও আমদপুর রাজবাড়ি,কালনা রাজবাড়ি,বড়শূল রাজবাড়ি,কুলগাছি রাজবাড়ি,চকদিঘী রাজবাড়ি, গুস্কারার চোংদার পরিবারের রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ি,পশ্চিম বর্ধমানের শিয়ারশোল রাজবাড়ি,উখড়া রাজবাড়ি,প্রভৃতি।তবে জেলায় যে জমিদার বা রাজবাড়িটির ভগ্নপ্রায় বিশাল কাঠামো পর্যটকদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে সেটি পূর্ব বর্ধমানের আউসগ্রাম অঞ্চলের কালিকাপুর গ্রামের রায়পরিবার নির্মিত জমিদার বাড়িটি।
      বুদবুদ বা মানকর স্টেশন থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তর দিকে শাল পিয়ালের বন পথ ধরে গেঁড়াই বিষ্টুপুর পেড়িয়ে শান্ত নিরিবিলি প্রকৃতির মাঝে এক প্রাচীন গ্রাম কালিকাপুর।এখানে আছে প্রায় ৪০০বছরের প্রাচীন জমিদার বাড়ি।বিশাল অট্টালিকার বেশিরভাগটাই ভগ্নপ্রায়,আগাছায় ভর্তি।তবুও শেষ অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রেখে এই জমিদারবাড়িটি আজও খুবই আকর্শনীয়।বিশেষ করে সিনেমা পরিচালকদের কাছে সুটিংকরার আদর্শ স্থান হিসেবে এ জমিদারবাড়িটি খুবই জনপ্রিয়,অসংখ্য বাংলা হিন্দি সিনেমা সিরিয়ালের সুটিং এ খানে হয়েছে; যেগুলির মধ্যে ঋতুপর্ণ ঘোষের 'নৌকাডুবি',রুদ্রনীল অভিনীত ' এলার চার অধ্যায় ',অর্পনা সেনের ' গয়নার বাক্স 'প্রভৃতি সাহিত্যধর্মী বা অন্যধারার সিনেমা যেমন আছে তেমনি আবার ' ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে ' এর মতো সিনেমাও রয়েছে।আবার বিখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেন হিন্দি ' খণ্ডহর' ছবির সুটিং এখানে করেছিলেন,যেটিতে অভিনয় করেছিলেন নাসিরউদ্দিন শাহ,পঙ্কজ কাপুরের মতো অভিনেতারা।এক ইতালি তথ্যচিত্রেরও সুটিং এখানে হয়েছিল।
  পার্শ্ববর্তী মৌখিরা গ্রামের পরমান্দ রায় ছিলেন বর্ধমানের মহারাজাদের দেওয়ান।বর্ধমান রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক।মহারাজার কাছ থেকে তিনি এই অঞ্চলের জমিদারি লাভ করলেন।তখন এ স্থান ছিল আরো গভীর জজ্ঞল,বন কেটে তিনি বানালেন সাত পুত্রের জন্য সাত মহল জমিদার বাড়ি।মৌখিরা গ্রাম তখন প্রায়ই কুনুর নদীর জল উপছে বন্যায় প্লাবিত হয়ে যেত,তাই তিনি জমিদার বাড়ি বানিয়ে ছিলেন কালিকাপুর গ্রামে।জমিদারবাড়ির প্রবেশ মুখে উত্তর দিকে এক ছোট্ট পুস্করিণী খনন কনন করলেন,আর সম্মুখে নির্মান করলেন দুটি শিব মন্দির।সেকালে এই জমিদার বাড়ি কোলাহলে সর্বদা মুখরিত হয়ে থাকতো।মহাসমারোহে ধূম ধাম করে হতো দুর্গা পুজো,এমনকি বর্ধমানের রাজবাড়ি থেকে কালিকাপুর এই জমিদার বাড়িতে তত্ব পাঠানো হতো।পুজোয় যাত্রা,কবি গানের আসর বসত,হাজার হাজার প্রজাসাধারণকে পাত পেড়ে খাওয়ানো হতো।এখন সে দিন আর নেয়।পুজোর এই বিশাল খরচা বর্তমান প্রজন্মের রায় পরিবারের সদস্যদের পক্ষে স্বাভাবিক ভাবেই বহন করা আর সম্ভবপর হয়ে উঠেনা,কিন্তু এক উপায় তাঁরা খুজে পেয়েছেন।এই জমিদার বাড়িটি এতোই কারুকার্যখচিত যে সারাবছর এখানে সিনেমা সিরিয়ালের কিছুনা কিছু সুটিং যেন লেগেই থাকে,তা থেকে যে সামান্য অর্থ পাওয়াযায় সে অর্থ গচ্চছিত রেখে বছর শেষে পুজোর সময় ব্যয় করা হয়।হয়তো আগের সেই সুদিনের মতো ঘটাকরে আয়োজন আর হয় না,তবুও সেই ধারাকে যথাসাধ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টার ত্রুটি থাকে না,আর এই যুক্তিটা দিয়েছিলেন মৃণালসেন।
     সাতমল জমিদার বাড়ির বেশিরভাগ অংশই এখন ধ্বংসপ্রায়,স্থানে স্থানে পলেস্তারা খসে পড়েছে।ঝোপ জজ্ঞল আর আগাছায় ছেয়েগেছে চারিদিক।তবুও বিশাল বিশাল থাম্বা মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে,ঝুল বারান্দা,আর অসংখ্য কক্ষ।দেখলেই বোঝাযায় সুপরিকল্পনা,দক্ষ প্রযুক্তিবীদ,নিপুণ কারিগর আর বিপুল অর্থ খরচ করে জমিদার মহাশয় এই মহল গুলি নির্মান করেছিলেন।এক মহলের দোতলায় সারি সারি একাধিক জানালা,এক জানালায় আবার দেখাযায় এক কপাট ফাঁক করে যেন উঁকি দিচ্ছে এক নারী,যেন  অন্দরমহলের আড়াল থেকে দেখে নিচ্ছেন বাইরের কিছু,অথবা কারোর অপেক্ষায়।আসলে এটা এক মূর্তি।সেদিন থেকে আজো শত শত বছর ধরে বিরামহীন এই প্রতীক্ষা! এই জমিদার বাড়ির কতো জন্ম-মৃত্যু,হাসি-কান্না,আনন্দ-বেদনা,উত্থান-পতনের নীরব সাক্ষী যেন এই নারী।

    প্রাচীন এই জমিদার বাড়িটি নিজস্ব বৈচিত্র,বৈশিষ্ট ও স্বীকতায় এতোটাই ব্যতিক্রমী যে তা দর্শনে আমাদের চেতনাকে উদ্বেল করে তুলে।এককালে এই মহলের প্রতিটি কক্ষ,বারান্দা জমিদার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি,অসংখ্য চাকর বাকরদের হট্টগোল,পাইক প্রহরী,গোমস্তা কর্মচারীদের কলরবে সর্বদা মুখোরিত হয়ে থাকতো।সেদিন আজ অতীত,কালের নিয়মে হতাশার অন্ধকারে মুখথুবড়ে পড়েথেকে এই সাতমহল জমিদারবাড়ি শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্বটুকু টিকেয়েরেখেছে যেন।
       রায়পরিবারের আদি নিবাস মৌখিরা গ্রামও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধময়।প্রচলিত আছে মধুময় ক্ষীরের মত ছিল এখানের আমের স্বাদ, তাই গ্রামের নাম হয়েছে ' মৌখিরা '।গ্রামটির বিশেষত্ব হলো,এখানে রয়েছে বেশকিছু  প্রাচীন মন্দির,যেগুলি অপূর্বসব টেরাকোটার কারুকার্যও নান্দনিক সৌন্দর্যে খুবই দৃষ্টিনন্দন।এছাড়াও আছে  ১৭৬১ শকাব্দে নির্মিত এক বিশাল প্রাসাদ প্রতিম দুর্গাবাড়ি।
      মৌখিরাগ্রামে প্রাচীন মন্দিরের সংখ্যা মোট ১২টি।গ্রামে প্রবেশ করেই প্রথমে চোখে পড়বে সুপরিকল্পিত ভাবে নির্মিত ডান দিকে ও বাম দিকে কিছু সারিবদ্ধ মন্দির।মাঝে সরু পথের শেষ প্রান্তে আর এক মন্দির।ডান দিকের মন্দির গুলি পশ্চিম মুখি ও বাম দিকের মন্দির গুলি পূর্ব মুখি।ডান দিকে একই ভিত্তিবেদির উপর মন্দির তিনটি দেউল রীতিতে নির্মিত, বাম দিকেও মন্দির সংখ্যা তিনটি;যার মধ্যে দুটি দুটি দেউল রীতিতে নির্মিত পূর্ব মুখি ও একটি আটচালা রীতিতে নির্মিত উত্তর মুখি।সবকটি মন্দিরই শিব ঠাকুরের।এইসব মন্দিরগুলিতে খিলানের উপর অংকিত অলংকরনে আছে  বিভিন্নধরনের  মোটিফ-রাধাকৃষ্ণ,শিব,পার্বতি,কালী,বাদ্যবাদক,ফুল,লতাপাতা,পাখি প্রভৃতি। গবেষকগণ এই বৈচিত্রকে পৌরাণিক,সামাজিক ও প্রাকৃতিক মোটিফে বিভক্ত করেছেন।একেবারে সামনে আছে একটি দক্ষিণমুখি আটচালা রীতিতে নির্মিত শিবমন্দির।এই মন্দিরটির সামান্য ডানদিকে রায়বাড়ির নিকট দেখাযাবে এক পঞ্চচূড়া রীতিতে নির্মিত লক্ষ্মী-জনার্দন মন্দির।এই মন্দিরটিই এখানের সবচেয়ে বড়ো ও আকর্ষনীয়,এটির টেরাকোটার কারুকার্যও অধিক।অলংকরণে শিল্পীর নিপুণ দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়, চতুর্ভুজ শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথা,বাল্যলীলা প্রভৃতি কাহিনী প্রকাশিত।দুঃখের বিষয় ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের বন্যায় এই মন্দিরগুলি ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং টেরাকোটার অনেক কারুকার্য নষ্ট হয়।
    মৌখিরাগ্রামের এই মন্দিরগুলি যে সব একই সময়ে নির্মিত হয়েছিল তা নয়।দক্ষিণমুখি আটচালা রীতিতে নির্মিত শিব মন্দিরটিতে টেরাকোটার ফলকে উৎকীর্ণ রয়েছে ১৭১৫ শকাব্দ,১২০০ সন।আঞ্চলিক গবষকদের অনুমান  এটি এই মন্দরের নির্মানকাল,পরবর্তীতে বা পূর্ববর্তীতে রায় পরিবারের বিভিন্ন সদস্যগণ অনান্য মন্দিরগুলি বিভিন্নকালে নির্মিত করেছিলেন।
  মৌখিরা গ্রামের পাচীন কারুকার্যখচিত মন্দির,দুর্গাবাড়ি ও কালিকাপুরের সাতমহল জমিদারবাড়ি প্রমাণকরে রায় পরিবারের প্রতিপত্তি,আর্থিক ক্ষমতা,ধর্মপরায়নতা ও সৌন্দর্য বোধের।







       উপরের ছবি গুলি মৌখিরা গ্রামের অপূর্ব মন্দির গুলির

      নীচের ছবিগুলি কালিকাপুর      জমিদারবাড়ির












বিঃদ্রঃ
প্রবন্ধটি আনন্দবাজার পত্রিকার বর্ধমান জেলার পৃষ্ঠায়প্রকাশিত।অন্যকোথাও এ প্রবন্ধ ও ছবি প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেয়ার করতে পারেন
  

Sunday, April 26, 2020

গলসীর  গ্রাম পরিচিতি(১)
                                     

    *খেতুড়া
(জে এল  ১০১)
            রাড় অঞ্চলের ধম'ঠাকুর ক্ষেত্রপালের নাম অনুসারে এই গ্রামের নাম হয়েছে খেতুড়া।বহু পূবে এই গ্রামের ব্রাম্ভন রা বাসন্তী পূজা করতেন ধূমধাম করে।চৈত্রমাসের শারদীয়া দূগা'পুজার মতো  চারদিন ধ রে মহিষাসুর মদি'নী সিংহবাহিনী দেবী দূগা' স প্তমী থেকে দশমী তিথিতে পূজিত হতেন।প্রচলিত আছে সাধক কবি কমলাকান্ত এই পূজা দশ'নে এসেছিলেন।গ্রামটিতে খুবই প্রাচীন সিংহ রাজাদের আমলের পুকুর 'সিংসায়ের ' আজো আছে।এই গ্রামটিতে হিন্দু,মুসলিম,বাউড়ি,মেটে,মাজি সাওতাল,বাউল,ফকির,জোলা বামুন,সেন,নাপিত প্রভৃতি নানা মানুষ পাশাপাশি বাস করে,যা এক গবে'র ব্যাপার।মহরমের সময় প্রতি বছর চন্দন নগরের আলো  সসজ্জাএই গ্রামে এক আলাদা প রচিতি দিয়েছে।

*খানো
(জে এল ১৩৯)
                    খানো লিংক স্টেশনের দক্ষিন দিকে রয়েছে এই গ্রাম টি।গ্রামের একেবারে ঈশান কোনে রেললাইনের ধারে দেবী ঈশান চণ্ডীর থান।স্তুপীকৃত ভাংা ইটের ডিবির উপর দেবীর পদচিহ্ন যুক্ত এক পাথর খন্ডকেই ঘিরে দেবীর অবস্থান।

*  উড়ো
(জে এল ১৩৭)
                  জি টি রোডের ধারে অবস্থিত এই গ্রামটি পাঠান ও মোগল যুগে পথিকদের বিশ্রাম স্থল রুপে ব্যবহৃত হত বলে এ স্থান টি "চটি" নামে প রিচিত।এই গ্রামে রয়েছে রায় প রিবারের প্রতিষ্ঠিত এক বিশাল দুগা'র মূতি'।এই ধ রনের বিগ্রহ পশ্চিম বজ্ঞে খুব এক টা দেখা যায় না, ঊনবিংশ শতকে গ্রামের ই বাসিন্দা ম নীন্দ্রনাথ রায় এবং অরুন রায় জোড়া রেখ দেউল রীতিতে শিব মন্দিরটি তৈরী ক রেছিলেন।কালাচান্দ নামে ধম'রাজের গাজন ও গ্রামে হ য়।গ্রামে র য়েছে রায় পরিবারেত প্রস্ত র নিমি'ত ম ন সা মূতি',ভট্টাচায' প রিবারের প্রস্ত র নিমিত' বিশালক্ষী দেবীর মূতি'।

*    ইড়কোনা
(জে এল ১০৩)
              বৈষ্ববীয় ভাব ধারায় পুষ্ট এই গ্রামটির প্রধান ঐতিহ্য প্রতি বছর মাঘ মাসে রাধা কৃষ্মের শ্মরনে মেলা।

*    গোহগ্রাম
(জে এল ৭০)
                   মল্লসারুল লিপিতে এই গ্রামটির নাম রয়েছে "গোধগ্রাম"।গ্রামের প্রাচীন দেবকীতি' হ লো চক্রবতী' পরিবারের দালান মন্দির। প্রতিষ্ঠা লিপি থেকে জানা যায় মন্দিরটি ১৭৯২শকাব্দে বা ১৮৭০ খ্রীঃ নিমি'ত হয়ে ছিল।এই মন্দিরে রয়েছে রাধা দামোদরের শাল গ্রাম শিলা।এই মন্দিরে গাত্রের টেরাকোটার কাজ খুবই সুন্দর
গ্রামে চৈত্র মাসে শিবের গাজন হ য়।

              গলসী অঞ্চলের প্রতি গ্রামে আছে এমন নানা ঐতিহ্য ময় পরিচিতি।আমরা নিজেরা যদি এবাভে নিজের নিজের গ্রামের কথাকে তুলে ধরি তাহলেই সমৃদ্ধ হবে এই প্রচেষ্টা।
                                                                           ক্রমশ...........
[4/10, 17:02] ফিরোজ/কাঞ্চন: গলসীর গ্রামঃঐতিহ্য ও স স্কৃতি

বাকতা(জে এল নং১১২)
        মধ্যযুগীয় প্রাচীন গ্রন্থে স্থানটির আদি নাম 'বকতক'।এখানকার বনিক সম্প্রদায়(তিলি ও তাম্বুলি)মধ্যযুগে বহিবা'ণিজ্যে যেতেন।তখনকার বনিকদের অট্টালিকা ও একাধিক মন্দিরের ধ্বংসস্তুপ আজো বত'মান, যেগুলি আনুমানিক চতু'দ্দশ_পঞ্চদশ শতাব্দীতে নিমি'ত।
♣♣♣
সারুল(জে এল ১৩৬)
          "সরু আল"থেকে গ্রামের নাম হয়েছে সারুল।গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত বড় শিব মন্দিরটি টেরাকোটার জন্য বিখ্যাত।প্রায় তিনশো বছর আগে ভূস্বামী শ্রী রামদুল্ল'ভ মুখোপাধ্যায় এই মন্দিরটি তৈরী করেছিলেন।
♣♣♣♣♣♣
গোপডাল(জে এল ৬৯)
             গ্রামের বেশির ভাগ অধিবাসী গোপ স ম্প্রদায়ের বলে গ্রামের নাম হ য়েছে গোপডাল।প্রধান অনুষ্ঠান ভগবতীর গাজন,এছাড়াওগ্রামে মনসা পুজা হয়,কাত্তি'ক মাসে ক্ষেপাকালীর পুজা হ য়।গ্রামের ধম'ঠাকুরের নাম বন্য রাজ রায়।
♣♣♣♣♣♣♣
বড়োমুড়ে/ছোটমুড়ে(জে এল ১৩৮)
            বহু আগে এখানকার বাঘা রাজাদের রাজবাড়ি ছিল খানোতে।সেই খানো রাজবাড়ি যাবার ছিল দুটো পথ,যেটি বেশি গুরুত্বপূন' সেটি বড়োমোড়>বড়োমুড়ে,অন্যটি ছোটমোড়>ছোটমুড়ে।
♣♣♣♣♣♣♣♣
পুরশা
          গ্রামটি জি টি রোডের দক্ষিণ ধারে অবস্থিত,রয়েছে গ্রামীন হাস্পাতাল।বহু আগে নাকি গ্রামটি আগুনে পুড়ে বারবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল,সেই থেকে নাম হয়েছে পুড়শা,আগে গ্রামটির নাম ছিল অভয়রাজ পুর।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
ভুড়ি(জে এল ১২৯)
               ভুশূরের পুত্র ক্ষিতিশূর রাড়ি ব্রাম্ভনকে৫৬টি গ্রাম দান করলে সেই গ্রামগুলির মধ্যে ভুড়ি নামটি পাওয়া যায়।গ্রামে র য়েছে গ্রামিন হাসপাতাল।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
সাঁকো(জে এল ১৫৪)
                মকুন্দ রামের চণ্ডীমজ্ঞল কাব্যে এই গ্রামের নাম আছে।ভারতে প্রথম ম হাভারতের ইংরাজী অনুবাদ যিনি প্রকাশ ক রেছিলেন সেই প্রতাপ রায় এই গ্রামের বাসীন্দা ছিলেন।এই গ্রামে আছে সূয' মূতি' "ঊষাদিত্য"।এই গ্রামে মাটির নীচে থাকে পাওয়া বিষ্ণু বাসুদেবের পাথরের মূতি'টি নবম দশম শতকের পাল যুগের ভাষ্কায্যে'র ঐতিহ্যবাহী।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
জুজুটি(জে এল ১৫৮)
             দামোদর নদের বাঁধের একেবারে গায়েই অবস্থিত এই গ্রামটি অতি প্রাচীন।গ্রামে রয়েছে রাজ্য সেচ বিভাগের অফিস ও বাংলো।শিব রাত্রিতে গ্রামে ধূম করে পূজা হয়।পোষসংক্রান্তির সময়  গ্রামে দণ্ডেশ্বরী র পুজা হ য়।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
কুরকুবা(জে এল ৯৭)
              গ্রামের প্রধান অনুষ্ঠান কমলা  নাম্নী মনসা  দেবীর পুজা।এক তালা দালান মন্দিরে দেবির প্রস্তর  মূতি' বিদ্যমান।প্রতি বছর শ্রাবন স ংক্রান্তিতে পুজো উপলক্ষে গ্রামে মেলা বসে।বহু আগে এই গ্রামে ছিল বৌদ্ধদের বাস,তার কিছু নিদশ'ন আজো আছে।এই গ্রামের মাজেদ মোল্লা আখমারা কল ও দুনি তৈরী ক রে খ্যাতি পেয়েছিলে।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
কৈতাড়া(জে এল ৭৪)
                মল্লসারুল লিপিতে এই গ্রামের নাম জানাযায়। "কবিন্থবাটক"গ্রামটি আগে বিখ্যাত ছিল পিতল কেন্দ্রিক ব্যবসার জন্য।এখানকার তৈলভাণ্ড ছিল খুব বিখ্যাত।আছে কম'কার পরিবারের উচু শিখর দেউল,শিব মন্দির।এছাড়া লাহা পরিবারের রাধাকৃষন ও শ্রীধরের বিগ্রহ উল্লেখ যোগ্য।ভট্টাচায' পরিবার প্রতিষ্টিত শিবলিজ্ঞের নাম কৈবালেশের।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣
সতীডাজ্ঞা
               বহু আগে এখানে ছিল আদড়াহাটি,কৈতাড়া,মহাড়া,বেলান গ্রামের একটি মহাস্মশান।এই ডাজ্ঞার শ্মশানে এক কালে সতীদাহ হতো,তাই নাম হ য়েছে সতীডাজ্ঞা।সতীর স্মৃতি মন্দির এখনো এখানে আছে,এই স্থানেই সাধক সবে'শ্বর সাধনা করতেন।এখানে আছে গ্রামীন হাস পাতাল
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
আদড়াহাটি(জে এল ৭৮)
মল্লসারুল লিপিতে গ্রামের নাম আছে "অধিঝকরক" ডঃ সুকুমার সেন এই গ্রামের নামকরন নিয়ে দুটি মত দিয়েছেন।এক  গ্রামে ছিল এমন এক হাট যেহাটে দর দাম হতো না,অ_দর হাটি।দুই গ্রামটি ছিল হাটিদের বসতি সেই থেকে আদড়া হাটি।অন্য মতে আদরেশ্বর শিবের নাম থেকে গ্রামের নাম হ য়েছে আদড়াহাটি।মুখাজি' পররিবারেরশিব লিজ্ঞ আছে।আছে একটি প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন মসজিদ।
♣♣♣♣♣♣♣♣
ইড়কোনা(জে এল ১০৩)
            প্রাচীন এই গ্রামটি ছিল বৈষ্ণবীয় ভাব ধারায় পুষ্ট।প্রতি বছর মাঘ মাসে রাধাকৃষ্ণের মেলা বসে।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣♣
গোহগ্রাম(জে এল ৭৩)
                মল্লসারুল লিপিতে গ্রামটির নাম গোধগ্রাম।চক্রবতী' পরিবারের দালান,রাধা দামোদরের মন্দিরের টেরাকোটা কাজ খুবই সুন্দর।
♣♣♣♣♣♣♣♣♣
উড়ো(জে এল ১৩৭)
       মুগল যুগে এই স্থানটি পথিকদের বিশ্রাম স্থল রুপে ব্যবহৃত হতো বলে উড়ো চটি।আছে রায়দের জয়দুগা'র প্রস্তর মূতি',শিব মন্দির।
♣♣♣♣♣♣♣
খানো(জে এল ১৩৯)
       গ্রামের ঈশান কোণে ঈশান চণ্ডীর থান,
♣♣♣♣♣♣♣♣
খেতূড়া(জে এল ১০১)
            গ্রামের বাউড়ি পাড়ায় ধম'ঠাকুর ক্ষেত্রপালের থান,এর নাম থেকেই গ্রামের নাম খেতুড়া।প্রচলিত সাধক কবি কমালাকান্ত এই গ্রামে দূগা'পুজা দশ'নে এসে ছিলেন।
♣♣♣♣♣♣♣♣
চান্না
            এই গ্রামে দুই বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের বাস ছিল।সাধক কবি ক মললাকান্ত এই গ্রামে মামার বাড়িতেই থাকতেন।বিশালাক্ষি ম ন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা ক রতেন।আর অগ্নি যুগের ব্রম্ভা,স্বাধীন্তা সংগ্রামী,ঋষী অরবিন্দের শহযোগী যতীন্দনাথের জন্ম এই গ্রামে,যিনি পরে সন্যাস নিয়ে স্বামীনিরালম্ব নাম নেন।
♣♣♣♣♣
শিড়রাই
         গ্রামটি খুবই প্রাচিন।প্রধান গ্রাম্য দেবতা শিব,সেই নাম থেকেই শিব্দে,শিড় রাই।বধ'মান জেলার বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবী ফকির চন্দ্র রায় এই গ্রামে জন্মেছিলেন।
♣♣♣♣♣♣♣
বেতালবন
              বিখ্যাত"শনিবারের চিঠি"পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাসের জন্ম এই গ্রামে।
♣♣♣♣
বাহির ঘন্যা
               বাইরের দিকের প্রদেশ।গ্রামের  হা জরা পাড়ার দুগা'মন্ডপে আছে তুলোট কাগজে খগের কলমে লেখা ২৫০_৩০০বছরের প্রাচীন পুথি,সব গুলি চৈতন্য জীবনী।
♣♣♣♣
পারাজ
            গ্রামটিতে আছে ব্বধ'মানের প্রথম বালিকা প্রাথমিক বিদ্যাল য়।চার আওলিয়ার মাজারে ওরস উপল ক্ষে মেলা বসে।
♣♣♣♣♣♣
কসবা
ক্ষেমানন্দের মনসামজ্ঞল কাব্যের প্রাচিন কসবা বা চম্পক ন গ র এই গ্রাম।আছে চান্দ স দাগ রের শিব মন্দির।বেহুলার বাসরঘর সাতালি পাহাড়।
♣♣♣♣♣♣♣
                          এইভাবে আমাদের প্রতি গ্রামে আছে নানা ঐতিহ্য,প রে আরো কিছু আলোচনা করা যাবে।
                           তথ্য সূত্র:
            ' গলসী কথা'_ফিরোজ আলি কাঞ্চন