Sunday, April 12, 2020

সুয়াতার পীর হজরত শাহ মাহমুদ বাহামানী


                                ফিরোজ আলী কাঞ্চন


              শ্রী চৈতন্য দেবের উদার মানবতাবাদী ধম'প্রচারের ফল স্বরুপ বাংলার মাটি হয়ে উঠেছিল এক মহা মিলনের পীঠস্থান।আবার অন্যদিক থেকে বিভিন্ন মুসলমান পীর,ফকির,দরবেশ,ওলি-আওলিয়া,আউল-বাউলের আবির্ভাব এই মিলনের পথে যেন সেতু রচনা করে।তখন অনেক হিন্দু সাধকের যেমন মুসলমান শিষ্য ছিল যেমন, শ্রী চৈতন্য দেবের শিষ্য যবন হরিদাস;তেমনি আবার অনেক মুসলমান পীর ফকিরের কাছে অনেক হিন্দুও দীক্ষ্যা নিয়েছিলেন।বাংলায় হিন্দু-মুসলমানের এই মিল মহব্বত সবচেয়ে সুন্দর ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল তুর্কি আক্রমনের পর।এ প্রসজ্ঞে বলতে হয় ' সত্যপীর ' এর কথা।সত্যপীর হলো হিন্দুদের সত্যনারায়ন  ও মুসলমানদের পীরের মিলিত রুপ। রাঢ়বজ্ঞের বিভিন্ন জেলার মুসলমানদের মধ্যে এখনো এই সত্যপীরের পালাগানের আসর বসে।আর হিন্দুরাও এই সত্যপীরকে সম্মান জানিয়ে সব ঠাকুরের বেলায় প্রসাদ  বললেও সত্যনারায়নের বেলায় সিন্নি বলে থাকে।সে যাই হোক বাংলার এই উদার মানসিকতা থেকেই এ সব পীর ফকিরদের বিভিন্ন অলৌকিক কেরামতির প্রভাবে ইনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এ সব মহাত্মার ইহলোক ত্যাগের পরে  ইনাদের  কবর জেয়ারত(বিশেষ প্রার্থনা)  করা হয়।মাজারে সিন্নি দেওয়া হয় বাতাসা খইচুড়। চড়ানো হয় সালু কাপড়ের চাদর।প্রতিদন সাঁঝ দেওয়া হয় প্রদীপ বা মোমবাতী ও ধুপ জ্বেলে।বছরের বিশেষ  দিনে পবিত্র উরসের আয়োজন করা হয়_এদিন থানে দেওয়া ভক্তদের মানতে দেওয়া মুরগী, হাস,ছাগল,আলু,কুমড়ো প্রভৃতি সহযোগে খিচুড়ি রান্না করা হয়;সেদিন হিন্দু মুসলমানের এক সাথে পাতপেড়ে থেতে কোন বাধা থাকে না।উসরস উপলক্ষে মেলা  বসে,সে মেলায় ফকিরি গান,কবি গান,বাউল গান,সত্যপীরের গানের আসর বসে।আমাদের ব্র্ধমান জেলাতেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এমন ব হু পীরের মাজার।তেমনই একজন বিখ্যাত পীর আউলিয়া হলেন হজরত বাহমান শাহ।
                    পুরো নাম হজরত শাহ মাহমুদ বাহামনী(রঃ)।আদি নিবাস বাহমান শহরে,তাই বলা হয় বাহমন শাহ।ইনি ছিলেন আরব উপদ্বীপের বিখ্যাত পীর হজরত শাহ জালালের অন্যতম শিষ্য।হজরত শাহ জালাল ইমন(ইয়েমন) দেশ থেকে শান্তি ও পবিত্রতার বাণী  প্রচারের উদ্দেশ্য  পদভ্রমনে বেড়িয়ে প্রথমে তিনি আরব থেকে ইরানে এসে পৌছালে অনেক ধম'প্রাণ সাধক তার সজ্ঞে যোগদেন,এদের মধ্যে ছিলেন আমাদের আলোচ্য বহমন শাহ,যিনি ইরানের সুখ্যাত নরপতি বাহমান-বিন-ইস্কান্দার এর বংশ বাহমনী বংশীয়।বহমান শাহ সাধনায় বাহমান শাহ সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে হজরত শাহ জালালের সজ্ঞে যোগদিয়ে ইরান থেকে আফগানিস্থান, কান্দাহার হয়ে হিন্দুস্থানে প্রবেশ করেন।দিল্লীর মসনদে তখন আলাউদ্দিন খলজি।
    বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে ঘটনাক্রমে বাহমান শাহ এসে হাজির হলেন গোপভূমে।এই গোপভূমের প্রাচীন জনপদ ভাল্কি অঞ্চলের সুয়াতা,জামতাড়া,প্রতাপপুর,অমরাগড় প্রভ্রতি অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে ইসলামের আদর্শ কে প্রচার করতে লাগলেন।জনশ্রুতি সে সময় এই অঞ্চলে প্রচলিত ছিল ভয়ংকর নরবলি প্রথা।পালি করে প্রতি বাড়ি থেকে একজন করে পুরুষ মানুষ পাঠাতে হতো বলির জন্য।বাহমন শাহ এই অমানবিক প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালেন।এতে ভাল্কীরাজা মনিন্দ্র নারায়নের সজ্ঞে তার বিরোধ বাঁধে।দুপক্ষে তমুল যুদ্ধ হয়।রাজার বিশাল সৈন্যবাহিনীর কাছে বাহমন শাহ পরাজিত ও নিহিত হন।যেহেতু এই যুদ্ধ ছিল সাধারন মানুষের পক্ষনিয়ে সেহেতু এই যুদ্ধে বাহমন শাহের মৃত্যু হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যেই গভীর রেখাপাত করে।
               অনেকে বলেন গোপরাজাদের আরাধ্যদেবতা শিবাক্ষ্যা মন্দিরের নরবলি প্রথা বন্ধ করতে গিয়ে বাহমান শাহের সজ্ঞে রাজার দ্বব্দ্ব বেধেছিল, এবং এই সময় বাহমান শাহের মৃত্যুর স ংবাদ পেয়ে গৌড়ের সুলতান হোসেন শাহ সৈন্য পাঠেয়ে ছিলেন ও পীরের মাজার বাধিয়ে দিয়েছিলেন ;সে হিসেবে তিনি হোসেন শাহের সমসাময়িক,(১৪৯৩-১৫১৯)।বাহমান শাহের মাজারে তিনটি শিলালিপি দেখলাম।তথ্য ঘেঁটে জানা গেল এগুলি আরবী তুঘরা লিপিতে লেখা।এর পাঠোদ্ধারও ক রা হয়েছে।এগুলির মধ্যে পাওয়া যায় ' পরম ন্যায় পরায়ন ও উদার সুলতান পৃথিবী শ্রেষ্ঠ ধর্মপরায়ণ সুলতান আবুল মুজাফফর হুসাইন শাহ'র নাম।এছাড়াও কাজী মিনাজী বলে এক জনের নাম পাওয়া যায়,এবংউল্লেখিত সাল হলো হিজরী ৯০২(১৪৯৬-৯৭খ্রিষ্টাব্দ)। কিএই কাজী মিনাজী ছিলেন সমম্ভবত ভাল্কীর কাজীপাড়ার বাসীন্দা,ইনিছিলেন বাহমান পীরের ভক্ত;এবং হুসেইন শাহের ককর্মচারী, হয়তো ইনারই অনুরোধে সুলতান পীরের মাজার বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন।
                    বাহমান।শাহ বা মোম্মান শাহের মাজারে বিশেষ বৈশিষ্ট আজো প্রত্যেকদিন সন্ধযায় ডঙ্কা বাজানো হয়।মাজারের প্রবেশ মুখের পাশেই আছে পীরপুকুর,এই পুকুরে স্নান করলে ভক্তের কামনা পূর্ণ হবে বলে বিশ্বাস।প্রতি বছর ১লা মাঘ এই পীরের বাৎসরীক উড়স উপলক্ষ্যে মাজার সংলগ্ন মাঠে এক বিরাট মেলা বসে,এটাকে অখণ্ড বর্ধমান জেলার সবচেয়ে বড়ো পীরের মাজার বলা যেতে পারে।বাহমান সাহেবের কেরামতি বা অলৌকিক কাহিনী সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে,পীরের মাজারে আগে গভীর রাত্রে ভাল্কির জজ্ঞল থেকে বাঘেরা সালাম জানাতে আসতো।এছারা শোনাযায় এক ধনী ব্যক্তি নতুন কেনা বন্দুকে এখানের শহীদস্থানের গাছে সর্বদা থাকা বকেদের মারলে মাজার কমিটির শজ্ঞে ঝামেলা বাধে,বিচারে ধনীব্যক্তির বিরুদ্ধে ভয়ে কেউ সাক্ষযীদিতে সম্মতি না হলেও ঝাঁকে ঝাঁকে বকের দল বিচারসভায় উড়েগিয়ে হাজির হয়েছিল।হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে সমস্ত সম্প্রদায়ের কাছে আজো খুবই জনপ্রিয় আউসগ্রাম থানার ভাল্কির কাছে সুয়াতাগ্রামের এই হজরত শাহ মাহমুদ মাহামানী সাহেবের মাজার।
----+++++++++++++++++++++++++++



 ৷     ৷৷   প্রাচীন বটবৃক্ষ
              পীর পুকুর
                 পীরের ব্যবহৃত দামামা
 ৷   ৷      ৷ হুসেনশাহ লিপি


Friday, April 10, 2020


ঐতিহময় গ্রাম গলসির চান্না

                        ফিরোজ আলী কাঞ্চন


রাঢ়বঙ্গের মধ্যমণি বর্ধমান জেলা এক প্রাচীন জনপদ।বর্ধমান জেলার বিভিন্নপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটেয়ে থাকা গ্রামগুলি ইতিহাস,সংস্কৃতি ও লোকায়ত ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ;তেমনই এক সমৃদ্ধময় গ্রাম পূর্ব বর্ধমানের গলসি অঞ্চলের চান্না।বহুপূর্বে  চান্নাগ্রামে যাবার পথে ছিল গভীর শালবনের জঙ্গল,আর সেই জঙ্গলে ছিল ঠ্যাঙাড়েদের রাজত্ব,লোকমুখে তাই প্রচলিত ছিল-' যদি যাও চান্না / ঘরে উঠবে কান্না।'
কুলগড়িয়া বাজার থেকে বা খানা জংশন স্টেশন থেকে চার-পাঁচ কিলোমিটার উত্তর দিকে খড়িনদীর তীরে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে শান্ত নিরিবিলি এই গ্রামটির মাটি দুই বিখ্যাত ব্যক্ত্বিত্বকে লালন-পালন করেছে,এঁরা হলেন মধ্যযুগের শাক্তপদাবলী সাহিত্যের বিখ্যাত কবি কমলাকান্ত ভট্টাচার্য ও অগ্নিযুগের ব্রম্ভা অভিধায় অভিহিত বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় বা স্বামী নিরালম্ব।


   সাধক কমলাকান্ত


           যদিও আনুমানিক ১১১৭ সালে(ইং-১৭৭০খ্রিঃ)অম্বিকা কালনায় বাংলা শাক্তপদাবলির অন্যতম কবি সাধক কমলাকান্ত ভট্টাচার্য্য জন্ম গ্রহন করেন,কিন্তু অকালে পিতা মহেশ্বর ভট্টাচার্য্যের মৃত্যু হওয়ায় মাতা মহামায়াদেবী তাঁর দুই সন্তান কমললাকান্ত ও শ্যামকান্তকে নিয়ে চলে আসেন বাপের বাড়ি গলসীর চান্না গ্রামে।মামা নারায়ণ ভট্টাচার্য্য এঁদের বেশকিছু জমি গবাদি পশু প্রদান করেন।কবির পৈতে দিয়েছিলেন এই মামা নারায়ণ ভট্টাচার্য্য।কমলাকান্তের ' সাধকরঞ্জন ' গ্রন্থে পাওয়া যায়--

          ' অতপর কহিশুন আত্মনিবেদন।

           ব্রাম্ভণ কূলে উপনীত স্বামী নারায়ণ।'

              এই সময়য় চান্না গ্রাম ছিল শিক্ষা দীক্ষ্যার পীঠস্থান।কমলাকান্ত গ্রামের টোলে ব্যাকরণ শাস্ত্র অধ্যায়ন করেনে এবং পরে তিনি নিজে একটি টোল প্রতিষ্ঠা করে অধ্যাপনা করতে থাকেন।কমলাকান্ত অবসর সময়ে গ্রামের মেঠো পথে উদাস হয়ে ঘুরে বেড়াতেন।পুত্রের সংসারের প্রতি উদাসীনতা দেখে মাতা মহামায়াদেবী কমলাকান্তের বিবাহ দিয়েদেন বর্ধমানের লাকুড্ডিতে ভট্টাচার্য্য পরিবারে।

                বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েও সংসারী হতে পারলেন না কমলাকান্ত।সর্বদা গ্রামের বিশালাক্ষী মন্দিরে উদাস মনে বসে থেকে ' মা-মা ' বলে ডাকতেন।মন্দির সংলগ্ন পুকুরপাড়ে বায়ুকোণে এক পঞ্চমুণ্ডির আসন স্থাপন করে সাধনায় মগ্ন থাকতেন।সাধনায় সিদ্ধিলাভ করলে কমলাকান্তের খ্যাতি বহুদূর ছড়িয়ে পড়ল।এদিকে দারিদ্র যেন নিত্য সজ্ঞী,সংসারে অভাব যেন দিনের দিন বেড়েই চলল।সাধকের এক অবস্থাসম্পন্ন ধনী ভক্ত চান্নায় এসে গুরুর আর্থিক দুরাবস্থা দেখে আবার কালনায় নিয়ে যান।সেখানেও কবি এক পঞ্চমুণ্ডির আসন প্রতিষ্ঠা করে সাধনা শুরু করেন।কিন্তু এখানের অবস্থান সুখকর হয় না,কিছুদিনের মধ্যেই মাতা মহায়াদেবীর মৃত্যু ঘটে।কবি ফিরে আসেন চান্নায়,এখানে আসার কয়েক মাসের মধ্যেই আবার এক দুর্ঘটনা,বিপত্নীক হন কবি।

         কমলাকান্ত দ্বিতীয় বিবাহ করেন কাঞ্চন নগরে,এই স্ত্রীর গর্ভে এক কন্যাসন্তানের জন্ম দেন।দারিদ্র তবুও যেন পিছু ছাড়ে না,সবদিন চালও জুটটো না,এমনই এক অভাবের দিনে এক শ্যাম বর্ণা মহিলা সাধকের বাড়িতে হাজির,সজ্ঞে দুই লম্বা চওড়া লোকের মাথায় ঝুড়ি ভর্তি চাল,আলু তরিতরকারী।কমলাকান্তর চান্না অভস্থান কালে প্রচলিত আছে এমনি সব কাহিনী।আরো প্রচলিতলিত আছে যে বিশালাক্ষী দেবীর মন্দিরের পুজোয় শোল ও মাগুর মাছ লাগবেই,কিন্তু কোথাও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না,এমন সময় শুনলেন পাশের পুকুরে জলের থেকে কারো উঠে আসার শব্দ,দেখলেন এল কালো কুচকুচে মেয়ে মাছ নিয়ে হাজির,হাসতে হাসতে বললো, ' আমি বাগদি পাড়ার মেয়ে গো,শুনলাম পুজোর জন্য তুমি কোথাও মাছ পাচ্ছো না,তাই দিতে এলাম,'।সাধক বললো,' কিন্তু আমার কাছে যে এখন পয়সা যে নেই মা ',বাগদি মেয়ে বললো,' সে তুমি কাল পাড়ায় দিয়ে এসো।'পরের দিন সারা বাগদি পাড়া তন্ন তন্ন করেও সেই কন্যার দেখা পাওয়া যায়নি।

           সাধক কমলাকান্তের মহিমার কথা ছড়িয়ে পড়তে থাকলো দিকে দিকে।দেওয়ান রঘুনাথ রায়ের পরামর্শে বর্ধমানের মহারাজ তেজচাঁদ তাঁর রাজসভার সভাকবি রুপে নিযুক্ত করেন সাধক কবি কমলাকান্তকে।মহারাজ কমলাকান্তকে কোলাহাটে একটা মায়ের মন্দির নির্মান করেদেন এবং বাৎসরিক বৃত্তির বন্দোবস্ত করেদেন।সাধকের জীবনে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়ের।

--------------------------------
     বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়

জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম দিকে দলে প্রাধান্য ছিল মডারেট বা নরমপন্থীদের,এঁরা ব্রিটিশ সরকারে সজ্ঞে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পরাধীন দেশবাসীর আশা আকাঙ্ক্ষা পুরন করতে চেয়েছিলেন,কিন্তু কার্জনের বজ্ঞভজ্ঞ বিরোধী আন্দোলনের সময় নরম পন্থীদের সজ্ঞে চরম পন্থীদের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই দুটি ধারারই ব্যপক প্রভাব বাংলার অনান্য স্থানের সজ্ঞে সজ্ঞে বর্ধমান জেলাতেও পড়েছিল,অনেক তরুণ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশ স্বাধীনের মহান ব্রতে।
                    বর্ধমান জেলাতে চরমপন্থী আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়।১৮৭৭খিষ্টাব্দে ১৯নভেম্বর  উনিশ শতকের বৈপ্লবীক সংগ্রামের অগ্নিময় প্রতিমূর্তি এই যতীন্দ্রনাথবন্দোপাধ্যায়ের জন্ম গলসীর চান্না গ্রামে।এই চান্না গ্রামে আবার বাংলা শাক্তপদাবলীর বিখ্যাত পদকর্তা সাধক কবি কমলাকান্তের গ্রাম,যদিও কবির জন্ম অম্বিকা কালনায়,কিন্তু অকালে পিতৃবিয়োগের জন্য তিনি মায়ের সজ্ঞে চলে আসেন চান্নায় ;এখানের বিশালাক্ষী মন্দিরে পঞ্চমুন্ডি আসনে সাধক কবি সাধনায় সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।
               সে যাই হোক,যতীন্দ্রনাথ ছিলেন বলিষ্ঠ সুস্বাস্থের অধীকারী,গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক পাঠ  সমাপ্ত করে তিনি বর্ধমানের রাজ কলেজে ভত্তি হলেন।চাত্রাবস্থাথেকেই যতীন্দ্রনাথের মনে স্বদেশ প্রেম আর জাতীয়তাবোধের সঞ্চার ঘটতে থাকে।তিনি স্থর করেন সামরিক বিভাগে যোগদিয়ে যুদ্ধের রণকৌশল আয়ত্ব করে তা দেশহিত ব্রতে প্র য়োগ করা।কিন্তু পিতা কালিচরণ বন্দোপাধ্যায়ের ইচ্ছে পুত্র কোন সরকারী উচ্চপদে চাকরী করুক।যতীন্দ্রনাথ রাজকলেজ থেকে এফ. এ. উত্তীর্ণ হয়ে বরোদায় নিজের নাম গোপন রেখে ছদ্মনামে অশ্বারোহী বিভাগে কাজে যোগদেন ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে।

বররোদার রাজ কলেজের অধ্যক্ষ্য তখন শ্রী অরবিন্দ ঘোষ।সেখানে দুজনের গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে।যতীন্দ্রনাথ অরবিন্দ ঘোষের কাছে বিপ্লব মন্ত্রে দীক্ষিত হন।তরুন যুবক যতীন্দ্রনাথ অরবিন্দর কাছে অনুরোধ জানান দেশের কাজে নিজেকে নিবেদিত করার সুযোগ করে দেবার জন্য।অরবিন্দ তাঁর সসহোদর বারীন্দ্র কুমার ঘোষের সজ্ঞে যতীন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে

কলকাতায় পাঠান বভিন্ন গুপ্ত সমিতি ও বপ্লবী দলগুলির সজ্ঞে গোপনে যোগাযোগ গড়ে তোলার জন্য।
        অরবিন্দ ঘোষের নির্দেশে ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে যতীন্দ্রনাথ কলকাতায় ফিরেএসে চার নম্বর শ্যামাপুকুর লেনে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষনের বাড়িতে অবস্থান করে অনুশীলন সমিতির সজ্ঞে নিজেদেরকে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্তকরে দেন।বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে সজ্ঞেনিয়ে কানাইলাল দত্ত,সত্যেন বসু,উল্লাসকর দত্তদের সাহায্যে মানিকতলার মুরারিপুকুর লেনে এক বোমাতৈরীর কারখানা গড়ে তুলেন,এই কারখানাকেই কেন্দ্রকরেই স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিখ্যাত মানিকতলা বোমামামলার কাহিনী।

         বজ্ঞভজ্ঞ আন্দোলনের পথনির্দেশিকা প্রদানের জন্য যতীন্দ্রনাথ ও বারীন্দ্রকুমার কল কাতায় আসার জন্য অরবিন্দ ঘোষকে আহ্বান জানান।অরবিন্দ বরোদার কলেজের সাড়ে সাতশত টাকার বেতনের চাকরী ছেড়েদিয়ে কলকাতায় এসে মাত্র পঁচাত্তর টাকার বেতনে জাতীয় কলেজে যোগদেন।যতীন্দ্রনাথ তাঁর তৈরীকরে দেওয়া বাংলা মায়ের একদল দামাল ছেলেকে অরবিন্দের দায়ীত্বে অর্পণ করে গুরু অরবিন্দের মন্ত্র শিষ্য হয়ে বৈপ্লবিক মতাদর্শকে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

          এই সময়ে পাঞ্জাবে করবৃদ্ধি ও চন্দ্রভাগা খালের জল কর আইনকে কেন্দ্রকরে বিপ্লববাদী শক্তি বৃদ্ধি পেতেথাকে।যতীন্দ্রনাথ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাঞ্জাবে পৌঁছে সেখানের বিখ্যাত বাবা গুরুদিৎ সিং সাহেবের সজ্ঞে সাক্ষাৎ করে বিপ্লবী দের একটি শাখা প্রতিষ্ঠিত করেন,যে শাখার অন্যতম সদস্য ছিলেন ভগৎ সিংয়ের পিতা কিশন শিং;এক কথায় যতীন্দ্রনাথ পাঞ্জাবে যেন ' গদর পার্টি 'র বীজ রোপন করে দিয়ে আস লেন।

        এতো কিছুর মধ্যেও যতীন্দ্রনাথের মনের গোপন কুঠিরে মাঝে মধ্যে যেন উদয় হতো এক একেবারে বিপরীত এক জীবনাদর্শন,তিনি যেন এই তীব্র বৈপ্লবিক জীবনের বাইরে আধ্যাত্মিক ভাবনায় মাঝেমধ্যে গভীর ভাবনায় তলিয়ে যেতে লাগলেন।আলমোরাতে অবস্থান কালে আধ্যাত্মিক সাধক শ্রীমৎ সোহহং স্বামীর নৈকট্য যেন যতীন্দ্রনাথকে পুরোপুরি বদলে দেয়,  সন্যাস গ্রহন করে নামনেন স্বামী নীরালম্ব।

               স্বগ্রাম চান্নায় ফিরে এসে স্বামী নীরাল ম্ব  খড়ি  নদীর তীরে সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রতিষ্ঠিত করলেন একটি আশ্রম।কিন্তু এই আশ্রমটি ক্রমে হয়ে উঠল কলকাতা থেকে বহুদূরে ব্রিটিশ পুলিশের চোখ এড়িয়ে বিপ্লবীদের আত্মগোপন করে থাকার বাংলার এক শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থান।রাসবিহারী বসু,ভগৎ সিং য়ের পিতা কিশন সিং সহ অসংখ্য বিপ্লবীর পদ ধূলি ধন্য এই চান্নার স্বামীনীরালম্বের আশ্রম।

          শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় ১৯২৭খ্রিষ্টাব্দে স্বামী নীরালম্বকে তাঁর অন্যতম শিষ্য শ্রী বিজয় বসন্ত বসাক বরাহ নগরে নিজের উদ্যান বাটিতে চিকিৎসার জন্য নিয়েযান,এই সময় ভগৎ সিং ক লকাতায় ছিলেন,তিনি এসে স্বামী নীরালম্বের আর্শিবাদ গ্রহন করেন।অবশেষে ১৯৩০খ্রিষ্টাব্দে অগ্নিযুগের ব্রম্ভা নামে বাংলার চরমপন্থী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কাছে সম্মানীয় স্বামী নীরালম্ব শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

            এ হেন ঐতিহ্যময় চান্না গ্রামের স্বামী নীরালম্বের আশ্রম আজ প্রচারের অন্তরালে।নেই কোন নজরদারি বা রক্ষনাবেক্ষনের ব্যবস্থা।এক বৃদ্ধ সন্যাসী দেখাশুনা করতেন তিনিও গত হ য়েছেন।এ প্রতিবেদককে তিনি প্রায়ই আক্ষেপ ক রে বলতেন,এই আশ্রমটিকে আর হয়তো রক্ষা ক রা যাবে না,আমি মারা গেলে কে আর দেখবে।" আশ্রম সংলগ্ন আদিবাসী  পাড়ার বাসীন্দারাই এখন মূলত তাদের ক্ষুদ্র সাধ্যমতো আগলে রেখেছে এই দেশপ্রেমের ঐতিহ্যময় স্থানটিকে।মাঝে মধ্যে বাৎসরিক অনুষ্ঠান কিছু উৎসাহী ব্যক্তি দ্বারা আয়োজিত হলেও সরকারী ভাবে এ আশ্রমটি অধিগ্রহন না করলে অচিরেই হয়তো হারিয়ে  যাবে।

   দুঃখের বিষয় এহেন চান্নাগ্রামের ঐতিহ্য আজ প্রচারের অন্তরালে।বহুবছর আগে কুলগড়িয়া বাজারে হাইওয়ের ধারে  সাধক কমলাকান্ত বা যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধায়ের নামাঙ্কিত চান্নাগ্রাম যাবার পথনিদর্শক ফলক দেখাযেত,কিন্তু এখন তাও নেই।অথচ ঐতিহ্যের গুরুত্বে চান্নাগ্রামে কমলাকান্তের বসতভিটে ও বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বা স্বামীনীরালম্বের আশ্রম হেরিটেজ হিসেবে ঘোষানার দাবিরাখে।
-------------------------------------
 চান্না গ্রামে কমলাকান্তের বসত ভিটায় সাধকের মূর্তি
     ৷ বিশালাক্ষী মন্দির
৷ ৷৷ ৷  এখানে পঞ্চমুণ্ডির আসনে সাধনা            করতেন
           স্বামী নীরালম্বের আশ্রম
     



Thursday, February 20, 2020


দেখে নিন বিশ্বে কোন ভাষায় কত সংখ্যক মানুষ কথা বলে

বিশ্বে মোট ভাষার সংখ্যা ৭হাজার ১১১টি
ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্ট প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী কোন ভাষায় কতো সংখ্যক মানুষ কথা বলে তা তুলে ধরা হলো---
১। ইংরাজী- ১১৩ কোটি ২৩ লক্ষ৷ ৬৬হাজার ৬৮০ জন।

২। মান্দারিন চাইনিজ -১১১কোটি৬৫লক্ষ ৯৬হাজার জন

৩।হিন্দি-৬১কোটি ৫৪লক্ষ৭৫হাজার ৫৪০জন।

৪।স্প্যানিশ - ৫৩ কোটি ৪৩লক্ষ ৩৫হাজার৭৩০জন

৫।ফ্রেঞ্চ- ২৭কোটি ৯৮ লক্ষ ২১ হাজার ৯৩০ জন

৬।আরবি- ২৭ কোটি ৩৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ৭০০ জন।

৭।বাংলা-২৬কোটি ৫০ লক্ষ ৪২ হাজার৪৮০ জন

৮।তেলেগু- ৯কোটি ৩৯ লক্ষ ৪০ হাজার ৩৪০ জন

৯।তামিল৮ কোটি ৯ লক্ষ ৮৯ হাজার ১৩০ জন

১০।মালায়ম ৩ কোটি ৭৮ লক্ষ ২৯ হাজার ৮৭০ জন

Wednesday, February 19, 2020

ঐতিহ্যময় মৌখিরা।
          # ফিরোজ আলি কাঞ্চন#
পূর্ব বর্ধমান জেলার আউসগ্রাম অঞ্চলের এই গ্রামে আছে বেশ কিছু প্রাচীন মন্দির।মানকর স্টেশন থেকে গেড়াই বিষ্টুপুর যাবার পথ ধরে প্রায় ২৫কিমি দূরত্বে এই গ্রাম,আবার এলেমবাজারের ১১মাইল থেকেও যাওয়া যায়।প্রথমেই চোখে পরবে সারিবদ্ধ ভাবে মুখোমুখি বেশ কিছু শিব  মন্দির।পশ্চিম মুখি তিনটি ডান দিকে ও পূব মুখি দুটি মন্দির বাম দিকে দেউল রীতিতে নির্মিত। বামদিকেই আর একটি উত্তর মুখি আটচালা রীতিতে নির্মিত মন্দির।একেবারে সামনে সোজাসুজি আর একটি আটচালা রীতিতে নির্মিত দক্ষিন মুখি মন্দির।এই মন্দির টি থেকে কিছু দূরে ডানদিকে উত্তর মুখি একটি বড়ো পঞ্চচূড়া লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির।প্রত্যেকটি মন্দিরের খিলানে টেরাকোটা কাজের নান্দনিক সৌন্দর্য খুবই আকর্ষনীয়।এই মন্দিরগুলি রায় পরিবার নির্মিত। মন্দির গুলির প্রতিষ্ঠা সাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না।দক্ষিণ মুখি আটচালা মন্দিরের ফলকে ১৭১৫ শকাব্দ,সন ১২০০ দেখা যায়।তবে এখানের সব মন্দিরগুলি যে একই সময়ে একই সঙ্গে নির্মিত হয়েছিল তা বলা যায় না।ঠিক মতো প্রচার পেলে এ গ্রাম ছোট খাটো পর্যটন কেন্দ্র রূপে গড়ে উঠতে পারে।
#ফিরোজ আলি কাঞ্চন#








Thursday, February 6, 2020


জি.আই.স্বীকৃত বর্দ্ধমানের সীতাভোগ  আর মিহিদানার
             
                                                   
রসোগোল্লা নিয়ে বাংলা আর ওড়িশার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও সীতাভোগ আর মিহিদানা যে বধ'মানের তা এতোদিনে নিশ্চিত হওয়া গেলো ২০১৭ সালে।দাজি'লিংয়ের চা,নবদ্বীপের দই,জয় নগরের মোয়া,ধনেখালির শাড়ি ইত্যাদির মতো বধ'মানের সীতাভোগ ও মিহিদানা
           বধ'মানে সীতাভোগ ও মিহিদানার জন্ম কাহিনী নিয়ে দুটি মত প্রচলিত।প্রথমত,১৯০৪সালের ৯আগষ্ট তখনকার ভাইসরয় লড' কাজ'ন এবং লেডি কাজ'ন বধ'মানে এসেছিলেন,ইনাদের আপ্যায়নের জন্য বধ'মানের মহারাজ বিজয় ছাঁদ মহাতাব নগরের নামকরা মিষ্টান্ন  প্রস্তুতকারী ভৈরবচন্দ্র নাগকে কোন নতুন ধরনের সুস্বাদু  মিষ্টি  তৈরীর প্রস্তাব দেন।ভৈরব চন্দ্র নাগ মহারাজের অনুরোধে প্রস্তুত করলেন দুটি অসাধারন মিষ্টান্ন, মূল উপকরণে সবেদা বা গোবিন্দভোগ চালের গুড়ি দিয়ে সীতাভোগ  আর বেসন দিয়ে মিহিদানা।আবার অন্যমতে ১৯০৬সালে বধ'মানে হওয়া নিখিল বজ্ঞ সাহিত্যসম্মেলনের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সম্মানীয় বিজ্ঞজন দের জন্যই নাকি প্রথম তৈরী করা হয়েছিল সীতাভোগ  ও মিহিদানার।জন্ম নিয়ে বিতক' যাই থাকনা কেনো,বধ'মানের এই সীতাভোগ  মিহিদানা  খেয়ে  মুগ্ধ হয়ে সুনাম করতে বাধ্য হয়েছিলেন লড' কাজ'ন থেকে ১৯৬৫সালে দুগা'পুরে কংগ্রেসের এক সম্মেলেনে এসে তখনকার  প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী ও জহরলাল নেহেরু পয'ন্ত।
               এতোদিন পয'ন্ত এই বিখ্যত মিষ্টান্ন দুটির প্রতি বধ'মানের কোন ভৌগলীক স্বীকৃতি ছিল না,কিন্তু ২০১৭ সালে১লা এপ্রিল জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকেশনের নিজশ্ব ওয়েবসাইটে সেই বহু প্রতিক্ষার স্বীকৃতির কথা জানানো হলো।জি.আই. সীতাভোগ কে সারা ভারতের মধ্যে ৫২৫ তম স্থানে,রাজ্যের মধ্যে ১২ তম স্থানে ও মিহিদানাকে দেশের মধ্যে ৫২৬ তম স্থানে,রাজ্যের মধ্যে ১৩ তম স্থানে ভৌগলিক স্বীকৃতি দিল।আর এই স্বীকৃতির মূলে রয়েছে শহরের তেতাল্লিশ জন মিষ্টি ব্যবসায়ীর এক সম্মিলিত প্রচেষ্টা।'ট্রেডাস' ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ' প্রথমে রাজ্য সরকারের মাধ্যমে সীতাভোগ  ও মিহিদানার জি.আই.স্বীকৃতির জন্য আবেদন জানায়,এই আবেদনের সজ্ঞে যোগকরে দেওয়া হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৫ই নভেম্বর  রেডিও আকাশবাণী তে প্রচারিত বধ'মানের বিশিষ্ট মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী নগেন্দ্র নাথের একটি সীতাভোগ ও মিহিদানাকে নিয়ে প্রতিবেদন।অবশেষে সেই প্রচেষ্টা স ফল হলো।
                         ২০১৭ তে  জি.আই.স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে সীতাভোগ মিহিদানা বধ'মানের ভোগলিক পরিচয়ে স ররকারী পরিচিতি লাভ করলো,এই ' জি আই লোগো' থাকার কারনে অনান্য জেলায় বা রাজ্যে এই মিষ্টান্ন দুটির বধ'মানের নাম ব্যবহার করতে হলে তা আইন মেনে ক রতে হবে,এতে সব'ত্র সীতাভোগ  ও মিহিদানার গুনগত মান বজায়থাকবে।
সে বছর ভারত সরকারের জি. আই. বা জিওগ্রাফিক্যাল ইনডিকশনের স্বীকৃতি আদায় করে ছাড়ল।


জানেন কি বাংলার কোন স্কুল রবিবারও খোলা থাকে?

স্বদেশ প্রেম আর ব্রিটিশ বিরোধীতার আদর্শ অনুসরন করে আজো রবিবার ক্লাসচালু থাকে গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে।

                                                           

বর্ধমান-হাওড়া কর্ড লাইনের উপর জৌগ্রাম স্টেশন থেকে উত্তরে আমড়া মোড়,নূড়ির মোড় ধরে দুই থেকে তিন কিলোমিটার গেলেই মেমারী রোড়ের ধারে অবস্থিত এলাকার সুপ্রাচীন এক শিক্ষ্যা প্রতিষ্ঠান_ গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।বিদ্যালয়টির গঠন-পঠন-পাঠন সব দিক থেকে অনান্য বিদ্যালয় গুলির মতোই স্বাভাবিক,কিন্তু নিজস্ব বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যে এই বিদ্যালয় যেন সারা দেশে এক ব্যতিক্রমী  নজিড় সৃষ্টি করেছে।ব্রিটিশ সরকার এখন আর এ দেশে না থাকলেও তাদের চালু করা প্রথা অনুসরন করে আজো আমাদের দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রবিবার বন্ধ রাখা হয়,কিন্তু গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়ে আজো রবিবার ক্লাস চালু থাকে,যা এই প্রথাগত ধারনার বাইরে থেকে এই বিদ্যালয় কে একটা আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।অবশ্য এর প্রেক্ষাপটে রয়েছে স্বদেশ প্রেম আর তীব্র ব্রিটিশ বিরোধীতের ঐতিহ্যের ধারা।
          ভারতবর্ষ  তখন পরাধীন।১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে কলকাতায় লালা লাজপত রায়ের সভাপতিত্বে জাতীয় ক ংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী  অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব পেশ করেন।এই অসহযোগ আন্দোলনের ইতিবাচক বা গঠনমূলক কর্মসূচিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন। দেশ বন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ঘোষণা  করলেন,"শিক্ষা অপেক্ষা করতে পারে কিন্তু স্বরাজের আর অপেক্ষার সময় নেই।"দলে দলে শিক্ষকেরা পদত্যাগ করতে লাগলেন,সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলি থেকে দিনের দিন ছাত্রের সংখ্যা কমে যেতে লাগলো।
অসহযোগ আন্দোলনের জোয়ার তখন ছড়িয়ে পড়েছে সারা বাংলায়।আর এই আন্দোলন কে সফল করে তুলতে নিজের নিজের সাধ্যমত আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে আপামর বাঙালি। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে বধ'মান জৌগ্রামের নিকট প্রতিষ্ঠিত হয় গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় প্রধান উদ্যোগী ছিলেন অবিনাশচন্দ্র হালদার মহাশয়,তিনি নিজের দান করা জমিতে প্রথমে যখন বিদ্যাল য় প্রতিষ্ঠা ক রেন তখন  ছিল খড়ের এক টি আটচালা।গোপালপুর গ্রাম বাসীর আরাধ্যদেবতা মা মুক্তকেশীর নাম অনুসারে বিদ্যালয়ের নাম রাখা হয় 'গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় '। অবিনাশচন্দ্র হালদারের সজ্ঞে সহযোগীতায় ছিলেন বিজয় কৃষ্ণকুমার,রাজবল্লভ কুমার,ভূষণ চন্দ্র হালদার প্রমুখগণ।
                 বিদ্যালয়ের সহঃ শিক্ষক নাজিবর রহমান জানালেন,  "বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রথম রেজোলিউশনে কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ব্রিটিশ বিরোধীতার তীব্র প্রমান রুপে রবিবার বিদ্যালয়ের পঠন পাঠন চালু থাকবে সেই ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে আজো আমাদের বিদ্যালয় রবিবার খোলাথাকে,এবং রবিবারের পরিবতে' সোমবার ছুটি থাকে।"
               বিদ্যালয়ের আরো কিছু সহঃ শিক্ষক পূণ'চন্দ্র মাজি,রাজীব রাহা,দেবব্রত রায়,লাল্টু কোলে,সৌরভ সরকার,ও সহঃ শিক্ষিকা তাঞ্জিলা খাতুনেরা জানালেন, "তখন বাংলার সমস্ত স্কুলকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমতিনিতে হতো,কিন্তু আমাদের বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় ছিল ইংরাজী ভাষা ও ব্রিটিশ বিরোধীতাকরে প্রতিষ্ঠিত সম্পূণ' বাংলা মাধ্যমের বিদ্যালয়।কিন্তু এটা ব্রিটিশ  সরকার মেনে নিতে পারলোনা,ফলে আমাদের বিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দিল না কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।এমন এক ঐতিহ্যময়  বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা  করে আমরা সত্যি গবি'ত।
             গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় শুধু তার ঐতিহ্যকে টিকিয়েই রাখেনি,চেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে চাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সামাজিক জ্ঞান ও দায়ীত্ববোধের সঞ্চার ঘটিয়ে এবং প্রথাগত শিক্ষযগত যোগ্যতার উচ্চসীমায় পৌছে দেওয়ার মহান ব্রত আজো সে দায়ীত্ব সহ কারে পালন করে যাচ্ছে।বর্তমানে এখানে কারগরি শিক্ষারও ব্যবস্থা চালু হয়েছে।এই বিদ্যালয়ের অসংখ্য প্রাত্তন ছাত্র ছাত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত,সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই বিদ্যালয়েরই প্রাত্তন ছাত্র ছিলেন।

               শত বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে এই বিদ্যালয় আজো তার ধারাকে অব্যাহত রাখতে পেরেছে।১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইংরাজী পড়াবার অনুম তি পায়,এবং ১৯৬৪খ্রিষ্টাব্দেউচ্চ মাধ্যমিক স্তরেউন্নিত এই বিদ্যালয়ের চাত্র ছাত্রীর স ংখ্যা বত'মানে প্রায় তেরোশো।এক কথায় নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারাকে আজো বজায়রেখে গোপাল পুর মুক্তকেশী বিদ্যালয় শুধু বাংলায় নয় ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলির মধ্যে একটা নিজস্ব পরিচিতি লাভ করেছে গোপালপুর মুক্তকেশী বিদ্যালয়।

লেখা ও ছবি ঃফিরোজ আলি কাঞ্চন

বিঃদ্রঃ লেখাটি এই সময় পত্রিকার বর্ধমান সমাচার পৃষ্ঠায় প্রকাশিত,এখানে কিছুটা পরিবর্তিত।এই লেখা ও ছবি কপি করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেয়ার করতে পারেন।

                     সাত দেউলিয়া আঝাপুর


           ফিরোজ আলী কাঞ্চন




বর্ধমান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য শিখর বা দেউল,যেগুলির নিজস্ব বৈচিত্র বিশেষত্বের দাবি রাখে।যেমন গৌরাঙ্গপুরের ইছাই ঘোষের দেউল,দেবিপুরের লক্ষ্মী জনার্দন মন্দির,জৌগ্রামের জলেশ্বর মন্দির,দুর্গাপুরের রাঢ়শ্বর শিব মন্দির,মাইথনের ক ল্যাণেশ্বরী মনন্দির,বরাকরে দামোদর নদের তীরে পাঁচটি দেউল মন্দির ছিল,বর্তমানে চারটি অবশিষ্ট আছে এগুলি একত্রে সিদ্ধেশ্বরী মন্দির নামে অভিহিত,প্রভৃতি।এই শিখর বা দেউল রীতির মন্দির গুলিকে সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করা যায়--রেখা দেউল,পিড়া দেউল,এবং বেগুনিয়া।আবার দেউল মন্দিরের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন নামে পরিচিত,যথা--প্রথমত ' পিষ্ট ' বা তলপত্তন,এটি মন্দিরের মাটির নীচের ভীত অংশ।দ্বিতীয়ত,  ' বাড় ' এটি পিষ্ট ' র পর থেকে মন্দিরের প্রবেশ দ্বারের উপরের অংশ পর্যন্ত।তৃতীয়ত  ' গঞ্জী ', এই অংশভাগ সবথেকে দৃষ্টিনন্দন ; দেউলের যা কিছু সৌন্দর্য  ও বৈশিষ্ট্যাবলী তা এ অংশেই প্রকাশিত।আর সবের উপরের অংশকে বলা হয়, ' মস্তক '।
            জামালপুর থানার আঝাপুর মৌজার দেউল গ্রাম।নিহার রঞ্জন রায় তাঁর  ' বাজ্ঞালীর ইতিহাস ' গ্রন্থে এ গ্রামকে বলেছেন, ' সাত দেউলিয়া আঝাপুর '। শোনা যায় আগে নাকি এই গ্রামে সাতটি দেউল মন্দির ছিল,আর 'রাজারপুর ' থেকে নাম হয়েছে আঝাপুর।কিন্তু কোন রাজা সে সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বর্তমানে অবশিষ্ট একটি মাত্র মন্দির। উড়িশ্যার রেখ দেউল রীতির, পঞ্চ রথাকৃতি পঞ্চ দ্বারের,কৌনিক খিলানের, প্রায় ৯ফুট প্রস্তে ও ৮০ ফুট উচ্চতার এই অপূর্ব স্থাপত্য নিদর্শনটি খ্রিষ্টিয় নবম-  দশম শতকে নির্মিত বলে অনুমান করা হয়।
           পোড়া ইটের তৈরি  এই দেউল মন্দিরটি সামান্য হেলানো,এ প্রসজ্ঞে জৌগ্রামের কল্যাণ দাস মহাশয় শুনালেন এক সুন্দর কাহিনী, " আমাদের এ অঞ্চলে প্রচলিত আছে যে, কোন এক মাতৃইভক্ত রাজা মাতৃ ঋণ শোধ করতে চেয়ে সাতটা মন্দির তৈরী করে দিয়ে মাতাকে বলেন, ' মা, এ মন্দির গুলি তোমাকে দিয়ে আমার মাতৃ ঋণ পরিশোধ করলাম '।পুত্রের এ হেন আচরণে মা অসন্তুষ্ট হলেন, মৃদু হেসে বললেন, ' মাতৃ ঋণ শোধ করা পুত্রের সাধ্যাতীত '।রাজা দেখলেন তার চোখের সামনে একের পর মন্দির ধসে পড়ে যেতে লাগল। তখন তিনি ভুল বুঝতে তেরে মায়ের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা প্রার্থনা করলেন,এবং শেষ মন্দিরটি যেটি ধসে পড়তে যাচ্ছিল সেটি উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে গিতে নিজের কণিষ্ঠ অজ্ঞুলি দিয়ে ঠেলে আটকালেন,মন্দির হেলে পড়তে পড়তে আর পড়ল না,সেই থেকে এই দেউল মন্দিরটি এমন ধারা হেলেই আছে। "

                   ঐতিহাসিকেরা মনে করেন পূর্বে এ স্থানটি ছিল জৈন তীর্থ ক্ষেত্র।পাল যুগের আগে বাঁকুড়া,পুরুলিয়া,বর্ধমান অঞ্চলে জৈন ধর্ম ব্যপক প্রভাব বিস্তার করেছিল।এই দেউল মন্দিরের মধ্যে দেখা যায় অষ্টম জিন চন্দ্রপ্রভের শিলামূর্তি ও এক গাছের নীচে দ্বাবিংশ জিন নেমিনাথের পাষাণ বিগ্রহ।দেউলের কাছেই আছে অগর দিঘী নামে এক বিরাট জলাশয়। অনুমান করা হয়ে থাকে হরণ্য দেশ বর্তমানের হরিয়ানার অগ্রোত নামক এক গ্রামের বণিকরা ব্যবসা সূত্রে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল, এদের বলা হতো ' অগর বালা ',এই ব ংশের ই কোন ব্যক্তি এই দিঘী এবং দেউল মন্দিরটি নির্মান করে দিয়েছিলেন।
             ------------++--------+